মহসিন কবির: ইরানে ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলা ও দেশটির সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর জেরে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটছে। এবং আরো বড় জোরে হামলা করা হবে এমন হুকার দেওয়া হচ্ছে। এ যুদ্ধের পর বিশ্ব তালমাতাল হয়ে পড়েছে। হু হু করে বাড়ছে তেল সহ নানা পণ্যের দাম। এ অবস্থা দুই সপ্তাহ চললে ছোট দেশগুলো মহা দুরবস্থা পড়বে এবং তুতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের বিষয়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৫ শতাংশ আমেরিকান এই হামলার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন; বিপরীতে প্রায় ৭৫ শতাংশ নাগরিকই এই সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে এখনো ‘কঠোর আঘাত’ করেনি। বড় হামলা এখনো বাকি। শিগগিরই ‘মূল আক্রমণ’ করা হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এ কথা বলেন।
ইরানি জনগণকে দেশটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার জন্য সামরিক হামলার বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র আরও কিছু করছে কিনা জানতে চাইলে ট্রাম্প ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিই তা করছি। তবে এই মুহূর্তে আমরা চাই সবাই ভেতরে (নিরাপদ স্থানে) অবস্থান করুক। বাইরে পরিস্থিতি নিরাপদ নয়।’ প্রেসিডেন্ট বলেন, পরিস্থিতি আরও অনিরাপদ হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখনো তাদের (ইরান) ওপর কঠোর আঘাত করা শুরুই করিনি। বড় ধরনের হামলা এখনো আসেনি। মূল আক্রমণটি শিগগিরই আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু ‘‘ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিশালী আঘাত’’ হেনেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ‘‘শত্রু চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।’’ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুরো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সম্পদ ইরানের সেনাবাহিনীর জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত হাফ ডজন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। শনিবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ফারস নিউজ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কুয়েতের আল-সালেম বিমান ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।
আমিরাতের আবু ধাবিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে। পাশাপাশি বাহরাইনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরে ও জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
একই সঙ্গে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও বিকট বিস্ফোরণ ঘটেছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি রিয়াদে বিস্ফোরণের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর পুনরায় সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এই আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করছে এবং জোর দিয়ে বলছে, এর জবাবে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার বৈধ অধিকার তেহরানের রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের অন্তর্বর্তী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানে বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট এবং কিছু ইসরায়েলি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, তেহরানে চালানো হামলার সময় আরাফি লক্ষ্যবস্তু হন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বা আন্তর্জাতিক প্রধান সংবাদ সংস্থাগুলো এখনো এ তথ্য নিশ্চিত করেনি।
সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ কার্যকর করে। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালনের জন্য অস্থায়ী তিন সদস্যের একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়।
এদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ইসরাইলি বিমানবাহিনীর কমান্ডারের অবস্থানে ইরানের খাইবার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথাও দাবি করেছে ইরান।