২৮ বছর বয়সী মিসরীয় মৎস্যজীবী মোহাম্মদ সাদ প্রতিবারের মতো শর্ম আল-শেখ উপকূলে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সে যাত্রায় আর ফিরে আসেননি। পরিবার মাসের পর মাস খুঁজে কোনো তথ্য পায়নি। এক বছর পর জানা যায়—সাদ সৌদি আরবের উত্তরাঞ্চলীয় তাবুক কারাগারে আটক আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয় মাদক পাচারের অভিযোগ।
আট বছর কারাবন্দী থাকার পর গত ২১ অক্টোবর সাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরিবারকে এ বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। পরে কারাগারের এক সহবন্দীর মাধ্যমে তারা খবর পান। মৃত্যুদণ্ডের পর তাঁকে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে, তাও জানে না পরিবার।
রোববার (১৬ নভেম্বর) সিএনএন জানায়, চলতি বছরে সৌদি আরবে যাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে—সাদ ছিলেন তাঁদেরই একজন। এ বছর দেশটিতে কয়েক শ মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই প্রাণঘাতী নয় এমন মাদক–সম্পর্কিত অভিযোগে অভিযুক্ত।
বার্লিনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইএসওএইচআর ও সৌদি গণমাধ্যম বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিপ্রাইভ’ বলছে, ২০২৪ সালে সৌদি আরবে ৩৪৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে—যা সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। ফাঁসিপ্রাপ্তদের বড় অংশই বিদেশি শ্রমিক—বিশেষ করে মিসর, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার নাগরিক—যারা জীবিকার সন্ধানে গিয়ে কঠোর বিচারব্যবস্থার মুখে পড়েছেন।
জানা গেছে, তাবুক কারাগারে আরও কয়েকজন বিদেশি মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় আছেন। তাঁদের একজন ২৭ বছর বয়সী মিসরীয় মৎস্যজীবী এসসাম আল-শাজলি। তাঁর বিরুদ্ধে অ্যামফিটামিন ও অল্প পরিমাণে ‘হেরোইনসদৃশ’ পদার্থ বহনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরিবারের দাবি—নৌকায় কী ছিল, শাজলি তা জানতেনই না।
সৌদি সরকার অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘকে পাঠানো চিঠিতে তারা বলেছে—গোপনীয়তা নেই, তিন ধাপের বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, বিদেশিদের কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের পর দেহ নিজ দেশের দূতাবাসে হস্তান্তর করা হয়। তবে পরিবার ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ—অনেক সময় আইনজীবীর সহায়তা মেলে না, আর পেলেও রায়ের কোনো পরিবর্তন হয় না।
তাবুক কারাগারের বিবরণ অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীরা প্রতিদিন সকালে আতঙ্কে থাকেন—সেদিন তাঁদের নাম ডাকা হবে কি না।
এদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশকে আধুনিকায়নের প্রচারণা চালাচ্ছেন—নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি, ধর্মীয় পুলিশকে সীমিত করা, সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা চলছে। সাত বছর পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরেও গেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে মানবাধিকার ইস্যু আলোচনায় আসার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা। অধিকারকর্মীদের মতে, বিপুল বাণিজ্য, অস্ত্রচুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের আড়ালে সৌদিতে ভয় দেখানোর নীতি অব্যাহত রয়েছে।
রিপ্রাইভের মধ্যপ্রাচ্যে মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক দলের প্রধান জিদ বায়সিউনি বলেন, পুরো ব্যবস্থাটিই গোপনীয়তা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়—যা ভুক্তভোগীদের পরিবারকে অন্তহীন অপেক্ষা ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে রাখে।