অর্থ বিভাগের এক সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের ৮১ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে মাঝারি থেকে অতি উচ্চ মাত্রার আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বিপিডিবি, ডেসকো, ডিপিডিসি, বাপেক্স, তিতাস গ্যাস, যমুনা অয়েল, টিসিবি, বিআরটিসি ও বিমান বাংলাদেশের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। সূত্র: বনিক বার্তা প্রতিবেদন
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাণিজ্যিক ভিত্তির চেয়ে গোষ্ঠীগত স্বার্থে পরিচালিত হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে এ প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের কাঠামোগত ও আর্থিক ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের বেশকিছু বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছর সরকারের জাতীয় বাজেট থেকে ভর্তুকি, অনুদান বা ঋণের মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়, যা সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নেয়া ঋণের বিপরীতে সরকার ‘সার্বভৌম গ্যারান্টি’ প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা সরাসরি সরকারের ঘাড়ে চাপে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় অদৃশ্য ঝুঁকি।
রাষ্ট্রায়ত্ত এবং কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেয়া বিপুল ঋণ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বাড়ছে এবং তারল্য সংকট গভীর হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি এবং সুশাসনের অভাব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করেছে। বেসরকারি খাতের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত এবং শ্রমের উৎপাদনশীলতা অত্যন্ত কম। উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সুবিধা করতে পারে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা সারের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মূল্য অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম নির্ধারণ করা হয়। রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ না করায় এ প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ীভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। মেগা প্রজেক্টনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলের কারণে বড় প্রকল্পগুলোর জন্য বৈদেশিক ঋণ নেয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বর্তমান যে চাপ এবং রফতানি আয় কমে যাওয়ার কারণে এ বৈদেশিক ঋণ ও তার সুদ পরিশোধের সক্ষমতাও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অর্থ বিভাগের তৈরি করা ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া সার্বভৌম ঋণ গ্যারান্টি থেকে উদ্ভূত সুনির্দিষ্ট আকস্মিক দায়, লোকসানি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য পুনর্ভরণ প্রয়োজনীয়তা থেকে উদ্ভূত পরোক্ষ দায় এবং সরকারি ইকুইটি বিনিয়োগ থেকে অপ্রাপ্ত মুনাফার বিষয়টি পর্যালোচনা করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর মুনাফা সক্ষমতা, তারল্য ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সাতটি আর্থিক মাধ্যমে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ১ থেকে ৫ স্কোরের মানদণ্ডে ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়েছে। এ ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি প্রতিষ্ঠান মাঝারি ঝুঁকি, ৩০টি প্রতিষ্ঠান উচ্চ ঝুঁকি এবং ১৯টি প্রতিষ্ঠান অতি উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে এ ১২২টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যার ৬২ শতাংশই হচ্ছে উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৪৯ প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার।
অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোকসানি চিনিকল, পাটকল বা টেক্সটাইল মিল রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালনার কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি নেই। এগুলো বন্ধ করে এদের অধীনে থাকা বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জমি সরকার অন্য লাভজনক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি (ওয়াসা) এবং জরুরি পরিবহন (বিআরটিসি) বা আপৎকালীন বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (টিসিবি) সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়াটা আত্মঘাতী হবে। উন্নত বিশ্বেও এসব জনগুরুত্বপূর্ণ সংস্থার মালিকানা সরকারের হাতেই থাকে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান বা আর্থিক ঝুঁকির পেছনে কোনো যৌক্তিক অর্থনৈতিক কারণ নেই। এখানে মূল সমস্যা ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।’
ডেসকোর উদাহরণ টেনে এ সাবেক সিনিয়র সচিব বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও ডেসকো অত্যন্ত লাভজনক ও পুঁজিবাজারের শীর্ষ কোম্পানি ছিল। কিন্তু বিগত সময়ে পেশাদারদের সরিয়ে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বা দলীয় লোকদের চেয়ারম্যান-এমডি নিয়োগ দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বেসরকারি খাত থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ কেনার মতো ভুল নীতিগত মডেলের কারণে এ খাতের প্রতিষ্ঠানকে লোকসান দিতে হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জনবল লোকসানকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। এ সংকট সমাধানের পথ দুটি—অপ্রয়োজনীয় ও বাণিজ্যিকভাবে অচল মিল-কারখানাগুলো বন্ধ বা বিক্রি করে দেয়া; আর সংবেদনশীল ও কৌশলগত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীন ও দক্ষ পেশাদারদের মাধ্যমে শতভাগ বাণিজ্যিক মডেলে পরিচালনা করা।’
দীর্ঘদিনের লোকসানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বর্তমানে অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সর্বোচ্চ স্কোর ৫-এর মধ্যে সংস্থাটি পেয়েছে ৪ দশমিক ৮৩। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম মূল্যে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতির মুখে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বিপিডিবির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। আর আলোচ্য অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান ছিল ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সংস্থাটি সরকারের কাছ থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি নিয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি নিয়েছে। বিপিডিবির খরচের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে। ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সংস্থাটিকে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের করা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা (ইউনিট) বিদ্যুৎ পাইকারি পর্যায়ে বিক্রিতে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতের বিশেষত বিপিডিবির আর্থিক সংকটের বিষয়টি দীর্ঘদিনের। সংস্থাটিকে এ জায়গা থেকে বের করে আনতে আমরা সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্যারিফ রিভিউ করেছি। যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির ট্যারিফ রিভিউয়ে আমাদের একটা কমিটি কাজ করছে। আইপিপিগুলো নিয়েও কাজ চলছে। ফলে এ অবস্থা যে একদিনে হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। আমরা চেষ্টা করছি।’
অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মধ্যে রয়েছে—মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড, শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড, জয়পুরহাট সুগার মিলস লিমিটেড, রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর সুগার মিলস লিমিটেড, কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড, মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড, পাবনা সুগার মিলস লিমিটেড, ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের আরো ছয়টি প্রতিষ্ঠান উচ্চমাত্রার আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এদের মধ্যে আছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)। সংস্থাটি বিপিডিবির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে ঢাকার একটি অংশ ও নারায়ণগঞ্জের গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে সংস্থাটি জানিয়েছে, ডিপিডিসির সামগ্রিক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার পরও বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের কারণে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট লোকসানের পরিমাণ ৬৪৩ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩০৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩৭ কোটি টাকা লোকসান করেছে। বিইআরসিতে জমা দেয়া প্রতিবেদনে ডিপিডিসি জানিয়েছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো না হলে সংস্থাটির রাজস্ব আয়, পরিচালন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়জনিত ক্ষতিতে ক্রমান্বয়ে রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। যদিও এরই মধ্যে বিইআরসি সব সংস্থার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে ঢাকার আরেক অংশের বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নীতকরণ, স্ক্যাডা সিস্টেম, প্রি-পেইড মিটার স্থাপন, ইআরপিসহ বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বড় অর্থ ব্যয় করেছে সংস্থাটি। তাদের একমাত্র আয় গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি। সংস্থাটি বলছে, গত কয়েক বছর যে হারে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, সেই হারে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়েনি। এতে সংস্থাটির আয় কমে গেছে।
বিদ্যুৎ খাতে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল), ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন বাংলাদেশ পিএলসি, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই লিমিটেড (নেসকো)।
তবে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই নয়, জ্বালানি খাতের সাতটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডও (বাপেক্স) আছে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে।
কোম্পানিটি দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত। তবে কোম্পানিটি যে হারে গ্যাস উত্তোলন করে তা দিয়ে রাজস্ব পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে। সরকারের ৫০ কূপ খনন কার্যক্রমে বাপেক্স প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খনন করছে। এসব কূপ খনন করতে গিয়ে কোম্পানিটি রিগ ক্রয়, কূপ খননে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) এবং বিভিন্ন বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এছাড়া দেশে জ্বালানি খাতের বিপণন কোম্পানি হিসেবে যমুনা অয়েল পিএলসি, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল), জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।
উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো জাতীয় পতাকাবাহী আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিমান সরকারের কাছ থেকে অবকাঠামো উন্নয়ন, উড়োজাহাজ কেনা, সভরেন গ্যারান্টি এবং দেশের বিমানবন্দরগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের একক কাজসহ সব ধরনের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছে। তবে দীর্ঘ ৫৪ বছরেও এসব সুবিধার সঠিক ব্যবহার করে একটি মানসম্মত এয়ারলাইনস হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি সংস্থাটি। উল্টো ধারাবাহিক লোকসান, বিপুল অংকের ঋণ এবং দায়-দেনার কারণে আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সংস্থাটি।
বিমানের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিমানের ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। এর বাইরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিমানের কাছে পাবে কমবেশি আরো ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিমান বোয়িংয়ের কাছ থেকে নতুন ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে, যেগুলোর চুক্তিমূল্য ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস ও ট্রাক পরিচালনা করে ৮৮ কোটি টাকা লোকসান করেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। পরিচালন অদক্ষতা, পুরনো হয়ে যাওয়া বাস এবং ট্রাকের বহর, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে না পারায় নিয়মিত লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বিআরটিসি।
ধারাবাহিক লোকসান এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। তিনি এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআরটিসির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়েছে। বিদেশী ঋণে ২০০৪, ২০১২ এবং সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালে বিআরটিসির বহরে নতুন গাড়ি যুক্ত হয়েছিল। একদিকে নতুন গাড়ি আসছে না, অন্যদিকে বিআরটিসির ওপর বড় ধরনের আর্থিক ও জনবলের চাপ তৈরি হয়েছে।
বিগত সরকারের সময়ে দূরদর্শিতার অভাব এবং নতুন গাড়ি আসার প্রত্যাশায় অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ছিল ৮ কোটি টাকা, তা গত বছর বেড়ে দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকায়। পরবর্তী সময়ে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে এ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভবিষ্যতে যদি পুনরায় বেতন ৫০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পায়, তবে নতুন গাড়ি ছাড়া বিআরটিসির পক্ষে এ চাপ সহ্য করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। আয় বাড়ানো ছাড়া সংস্থার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।’
উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে থাকা আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএ। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বিআইডব্লিউটিএ সাকল্যে ৫৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি দায়ের পরিমাণ ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোও উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের লোকসান ১৩৪ দশমিক ৯০ কোটি টাকা। চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের লোকসান ৩৩ দশমিক ২০ কোটি টাকা। লোকসানের কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিজাইন অনুযায়ী উপযুক্ত চাপে এবং পরিমাণে গ্যাস না পাওয়া, উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, খুচরা যন্ত্রাংশ ও মেরামত খাতে ক্রমেই ব্যয় বৃদ্ধি, চলতি মূলধনের ঘাটতি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোও উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীনের ১৫টি চিনিমিলের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান ৬৭৯ দশমিক ১৩ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন থেকেই চিনিকলগুলোতে সরকারকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এছাড়া ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড, এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড, খুলনা ওয়াসা এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি) উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।
ঝুঁকি মোকাবেলা করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক ও টেকসই করতে প্রথাগত অর্থনৈতিক মডেল পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এজন্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর প্রকৃত সম্পদের গুণগত মান এবং দায়ের পরিমাণ নির্ধারণে কঠোর পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতা দূর করে ব্যবসাবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাণিজ্যিক নিয়মে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা, যাতে সাধারণ মানুষের করের টাকার অপচয় বন্ধ করা যায়।
অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে যে ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে তার মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার বিরুদ্ধে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত না করার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন ৩৯২টি কোম্পানি, সংস্থা, করপোরেশন, কর্তৃপক্ষ ও প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে চিঠি দিয়েছিল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। এর মধ্যে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠানই প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এফআরসির কর্মকর্তাদের ধারণা, আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি না করার কারণেই হয়তো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা জমা দিতে পারেনি।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সবই দীর্ঘমেয়াদে রুগ্ণ এবং লোকসানি। এটি কোনো নতুন সমস্যা নয়; ঐতিহাসিকভাবেই এগুলো দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ক্রমাগত পতনের দিকে গেছে এবং কেবল সরকারি ভর্তুকিতে টিকে আছে।’
তিনি মনে করেন, একটি গতিশীল ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে চাইলে এ বিশাল আর্থিক বোঝা টেনে নিয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এখনই সময় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার। আমাদের একটি সামগ্রিক নীতিমালার অধীনে স্পষ্ট মূল্যায়ন করতে হবে—কোন প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় খাতে রাখা যৌক্তিক আর কোনগুলো নয়। উদাহরণস্বরূপ বিশ্বজুড়ে এমনকি আমাদের উপমহাদেশেও (যেমন পাকিস্তানের পিআইএ) রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার লোকসান ঠেকাতে বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতের বিমান সংস্থা বা চিনিকলগুলো যদি একই বাজারে সফলভাবে মুনাফা করতে পারে, তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কেন বছরের পর বছর লোকসান দেবে? গলদটা স্পষ্টতই ব্যবস্থাপনায়। তাই সমাধান হিসেবে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় খাতে থাকবে সেগুলোকে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে চালাতে হবে। আর যেগুলোতে তা সম্ভব নয়, সেগুলোকে প্রয়োজনে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে।’