শিরোনাম
◈ আসিফ আকবর আটক হননি, গুজব উড়িয়ে দিলেন নিজেই! ◈ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও বৃহৎ শক্তির ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ◈ বিশ্বকা‌পের প্রস্তু‌তি ম‌্যা‌চে ‌রোববার সকা‌লে মিশরের মুখোমুখি ব্রাজিল ◈ অপরাধী শনাক্তে ঢাকায় এআই প্রযুক্তি: ২ লাখ অপরাধীর তথ্য যুক্ত হচ্ছে, মুখমণ্ডল শনাক্ত করে পাঠাবে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা ◈ এবা‌রের বিশ্বকা‌পে আ‌র্জেন্টিনা ক‌তোটা শ‌ক্তিশালী, রোববার সকা‌লে পরীক্ষা নে‌বে হন্ডুরাস ◈ দেশের শিশুস্বাস্থ্যে গবেষণার কেন্দ্র বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, তবু শয্যা ও প্রযুক্তি সংকট ◈ কাল শুরু হচ্ছে সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন, বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ◈ 'অনেক কষ্টে এসএসসি পাস করেছে' কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসককে নিয়ে আসিফের কড়া মন্তব্য; দিলেন বরাদ্দের ব্যাখ্যা ◈ তুরস্ক কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে? ◈ ট্রাম্পের জন্য ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’: জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত চায় ইরান

প্রকাশিত : ০৬ জুন, ২০২৬, ১০:৩২ রাত
আপডেট : ০৬ জুন, ২০২৬, ১১:২৫ রাত

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও বৃহৎ শক্তির ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি কোনো বৃহৎ শক্তির কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠার মধ্যে নিহিত নয়; বরং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং অভ্যন্তরীণভাবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার মধ্যেই এর মূল ভিত্তি নিহিত।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতন, পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল এবং এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের আবির্ভাব-এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের সামনে দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট। প্রথমত, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং কোভিড-১৯, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। দ্বিতীয়ত, ভারত, চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র-এই চার প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে বাংলাদেশ কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার নিঃসন্দেহে অর্থনীতি। পররাষ্ট্রনীতি যতই আলোচিত হোক না কেন, সাধারণ মানুষের কাছে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধার ন্যায্য বণ্টনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে শুধু রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ নয়, অর্থনৈতিক বৈষম্যও বড় কারণ ছিল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে উন্নয়নের সুফল সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

সুতরাং নতুন সরকার কেবল পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের জায়গায় নতুন নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করলেই চলবে না। এর রাজনৈতিক বৈধতা নির্ভর করবে জনগণকে এই বিশ্বাস দিতে পারার ওপর যে রাষ্ট্র কোনো দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং নাগরিকদের সেবার জন্য পরিচালিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশের শক্তি ও দুর্বলতা-উভয়কেই সামনে নিয়ে আসে। কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের ফলে ২০২২ সালে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে তা প্রায় ৫.৮ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২৪ সালে আরও কমে যায়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৫ শতাংশে নেমে এলেও ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে তা প্রায় ৪.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।

তবে এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনীতির জন্য যথেষ্ট নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে দেশকে আবারও ৭ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হবে।

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এফডিআই প্রবাহ ১.২ থেকে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ২০২৪ সালের তুলনায় বেশি এফডিআই আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনারই প্রতিফলন।

তবে দেশের আকার ও সম্ভাবনার তুলনায় এই বিনিয়োগ এখনও অনেক কম। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি, লজিস্টিকস, ডিজিটাল সেবা, ওষুধশিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতে বৃহত্তর ও বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।

অন্যদিকে, বৈদেশিক নীতির চ্যালেঞ্জও কম নয়। শেখ হাসিনার আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল, যদিও তিস্তার পানি বণ্টনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা অমীমাংসিত থেকে যায়।

বর্তমান সরকার সেই ভারতকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। এর পেছনে যেমন রয়েছে কৌশলগত বৈচিত্র্য আনার ইচ্ছা, তেমনি রয়েছে নতুন নেতৃত্বের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের প্রচেষ্টা।

তবে বাংলাদেশের উচিত প্রতীকী পদক্ষেপ ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা অবশ্যই অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্য এক বিলিয়ন ডলারেরও কম, ফলে সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্বের চেয়ে প্রতীকী গুরুত্বই বেশি।

বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামোও এই বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রায় ১৭.৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিমাণ কমে প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি উদ্বেগজনক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার হলেও আমদানি ছিল প্রায় ৬৪.৩ বিলিয়ন ডলার, ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২০.৪ বিলিয়ন ডলার।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত গভীর হচ্ছে, ততই বেইজিংয়ের প্রভাবও বাড়ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে চীন থেকে দূরে থাকতে হবে; বরং প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সম্পৃক্ততা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের জন্য ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে। পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি এলএনজি, এলপিজি ও জ্বালানি সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তবে একই সঙ্গে নতুন ধরনের কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনও তৈরি করছে।

ভারতের জন্যও এই পরিবর্তনগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশের প্রতি নেতিবাচক রাজনৈতিক বক্তব্য বা অভিবাসন প্রশ্নে উসকানিমূলক ভাষা দুই দেশের সম্পর্ককে দুর্বল করে। আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশকে কনিষ্ঠ প্রতিবেশী নয়, বরং একটি সার্বভৌম ও সমমর্যাদাসম্পন্ন অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম পথ হলো ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী কূটনীতি। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিয়োগ ও জ্বালানি সম্পর্ক, ভারতের সঙ্গে আস্থাপূর্ণ অংশীদারিত্ব এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক-সবকিছুকে জাতীয় স্বার্থের আলোকে পরিচালনা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারকে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ন্যায্যতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হবে। বাংলাদেশের সামনে সুযোগের অভাব নেই। চ্যালেঞ্জ হলো, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে জাতীয় উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করা, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার ফাঁদে আটকে না পড়া।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়