ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছে বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র ইসরাইল। এতে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য। অঞ্চলটিতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ বিশ্ব জ্বালানি তেলের বড় উৎস এই মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বাংলাদেশের বাজারেও তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ডলার সরবরাহ হ্রাস করবে। ডলারের সংকট বাড়লে টাকার মান দুর্বল হবে। একইসঙ্গে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বেড়ে যাবে। উৎপাদন খরচ বাড়বে। কাঁচামালের সংকট দেখা দেবে। সময়মতো পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। শিল্প খাতে ধস নামবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এটা এক মহাবিপদ সংকেত। কারণ দেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ হয় এই প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊল্লম্ফন হলে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, ভোজ্য তেল, সার ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং সামাজিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, আমদানিনির্ভর ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়বে, রিজার্ভ আগের মতো আসবে না, মূল্যস্ফীতি বাড়বে ও শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটবে।
অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের প্রভাব পড়বে পুরো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তেলের দামের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক আছে, বিদ্যুতের সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচ যুক্ত। সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলা করছে। বিশেষভাবে বিনিয়োগে খরা চলছে। শিল্প খাতও ভালো নেই। উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। এতে শিল্প উদ্যোক্তারা বিপাকে আছেন। জ্বালানি খরচ অনেক বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আমাদের দেশের অর্থনীতি বেশ চাপে পড়বে।
বিশ্লেষক মো. মাহফুজ শেখ বলেন, প্রায় ৬০-৭০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। বর্তমানে শুরু হওয়া যুদ্ধ যদি পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে গভীরভাবে পড়তে পারে। যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়বে। বাংলাদেশে পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন ও এলপিজির দাম বাড়তে পারে। পরিবহন খরচ বাড়লে সব পণ্যের দাম বাড়বে। এছাড়া বাংলাদেশি কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। অনেক প্রবাসী হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নির্মাণ, সার্ভিস এবং পরিবহন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন ভিসা ও কর্মক্ষেত্র সংকট সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে।
নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পেশাক খাতের বেশির ভাগ কাঁচামাল মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আমদানি হয়। আবার রপ্তানি করা পণ্যেরও যাতায়াত এই পথে। যুদ্ধের ফলে আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমাদের শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমে আসবে। আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে দেশে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে দেরি হলে শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বিশ্বের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় তেল ও বাণিজ্যিক কোম্পানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশে আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। এ ছাড়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়লে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ব্যাহত হলে রপ্তানি ও আমদানি কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে কারখানা পরিচালনার খরচ বাড়বে। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে রপ্তানিতে বড় ধাক্কা আসবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সব ব্যবসা বাণিজ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়ে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো বাংলাদেশের নতুন একটি সংকটে পড়া। এতে দেশের জ্বালানি তেলে সংকট তৈরি হবে। ফলে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, আমাদের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ কমে যাওয়া আমাদের জন্য বিপর্যয় বয়ে আনবে। প্রবাসীদের নিয়ে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য দেশে আমাদের জনশক্তি আছে। যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশিরা যদি আয় করতে না পারে, তারা রেমিট্যান্স পাঠাবে কোথা থেকে? উৎস: মানবজমিন।