বরিশালের চর হোগলা গ্রামের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে এই অদ্ভুত স্থাপনা। স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিত। আর সাইনবোর্ডে লেখা আছে, পর্তুগিজ আমলের পাঞ্জেগানা মসজিদ। অনেকেই মানত করে এখানে এসে নফল নামাজ আদায় করেন।
প্রথম দেখায় মনে হয়, কোনো প্রাচীন স্থাপনাকে জড়িয়ে ধরেছে প্রকৃতি। বিশাল গাছের শিকড় ছাদ বেয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। সেই গাছের বাকল আর লতাগুল্ম যেন আলতো করে আগলে রেখেছে মসজিদের ছোট্ট এক গম্বুজ। দূর থেকে দেখলে বোঝাই যায় না, এটি আসলে একটি মসজিদ।
স্থানীয় লোকজনের ভাষায়, একসময় পুরো এলাকাই ছিল ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এই ছোট্ট মসজিদ। হঠাৎ করেই এটি নজরে আসায় স্থানীয় লোকজন তাই এটিকে গায়েবি মসজিদ বলে। সেই নামেই মসজিদটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থাপনাটি খুবই ছোট। দৈর্ঘ্য ছয় ফুট, প্রস্থ পাঁচ ফুট, আর উচ্চতা প্রায় সাড়ে সাত ফুট। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের দুই পাশে ছোট দুটি জানালা এবং পূর্ব দিকে সরু একটি প্রবেশপথ রয়েছে। ইট ও চুন-সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি এই স্থাপনাটি দেখে ইতিহাসবিদদের ধারণা, এটি সম্ভবত মোগল আমলের কোনো সময় নির্মিত হয়েছিল।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথ পাহারা দেওয়ার সময় পাহারাদারদের ইবাদতের জন্য এমন ছোট স্থাপনা তৈরি করা হতো।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, নির্জনে ইবাদত করার জন্য সুফি সাধক বা দরবেশদের জন্যও এ ধরনের মসজিদ নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান বলেন, ‘এই ধরনের ছোট স্থাপনা বাংলাদেশে খুবই বিরল। দক্ষিণাঞ্চলে মোগলদের সময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে সংঘর্ষের ইতিহাস রয়েছে। সেই সময়কার প্রেক্ষাপটও এই ধরনের স্থাপনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এরই মধ্যে মসজিদটি পরিদর্শন করে সংরক্ষণের সুপারিশ করেছে। স্থানীয় লোকজনেরও একই দাবি, গাছের শিকড়ে জড়িয়ে থাকা এই অদ্ভুত মসজিদটি যেন হারিয়ে না যায়। কারণ চর হোগলার নির্জন গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা এই ক্ষুদ্র স্থাপনাটি শুধু একটি মসজিদ নয়, সময়ের ভেতর থেকে উঠে আসা এক নিঃশব্দ ইতিহাস। প্রায় ৫০০ বছরের সেই ইতিহাসকে আজও আগলে রেখেছে প্রকৃতি।