এল আর বাদল: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে শুধু যে টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছিল, তা-ই নয়, গোটা স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস করে দিয়েছে বলে অভিযোগ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাঁর কথায়, এই কারণেই মহামারী হিসেবে হাম ছড়িয়ে পড়েছে, লক্ষাধিক শিশু তাতে আক্রান্ত হয়েছে, সরকারি হিসেবেই মারা গিয়েছে সাড়ে ছ’শো। হাসিনার দাবি, ‘বর্তমান সরকারও এ সবের তদন্ত না-করে আওয়ামি লিগকে দোষারোপের মিথ্যাচারে ব্যস্ত।
হাসিনা বলেন, ‘আমি দৃঢ় ভাবে বলতে চাই, হামে শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী প্রতিটি ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে! যাঁরা টিকাকরণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাঁরা ‘হু’-র সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন, যাঁরা টিকা সরবরাহ ব্যাহত করেছেন, তাঁদের জবাব দিতেই হবে। স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে অবহেলা, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হবে, তাঁদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
মুজিব–কন্যার সংযোজন, ‘সব চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো— এই শিশুরা এমন একটা রোগে মারা যাচ্ছে, যা আমরা প্রায় নির্মূল করার পর্যায়ে ছিলাম এবং সব ঠিক থাকলে ২০২৬–এই আমরা বাংলাদেশকে হাম-মুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করতাম।’ তা হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন? হাসিনার জবাব, শুধু টিকাদান কর্মসূচি বন্ধই নয়, পুরো স্বাস্থ্য খাতকেই ইউনূস সরকার ধ্বংস করেছে। শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সরকারি হাসপাতালগুলিতে জরুরি চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহ নেই।
হাসিনার উদ্দেশে প্রশ্ন ছিল, ‘ইউনূসের নোবেল শান্তি পুরস্কার কেড়ে নেওয়া উচিত, এমন দাবিও উঠছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?’ বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর জবাব, ‘পুরস্কার কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি নোবেল কমিটির এক্তিয়ার। সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না। কিন্তু নৈতিক প্রশ্ন তো উঠবেই। যে ব্যক্তির স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশু মারা যায়, তার ‘নোবেল শান্তি’ পরিচয়ের অর্থ কী?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘তা হলে বাজেটের ৪২ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?
হাসিনার অভিযোগ, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামি লিগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বিএনপি ও জামায়াত— এই দুই দলকে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামি সভানেত্রীর কথায়, ‘অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে বাংলাদেশে যে দমনমূলক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটিকে আরও স্থায়ী করেছে বর্তমান সরকার। শুধু মুখ বদলেছে, কোনও নীতির পরিবর্তন হয়নি।’ হাসিনা যোগ করেন, ‘২০০১-০৬ নাগাদ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশকে যেমন ভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, ১০০ দিনে সেই স্মৃতিই ফিরিয়ে এনেছে বর্তমান সরকার।
হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘তারেক রহমান কি পুরো পাঁচটা বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন বলে আপনি বিশ্বাস করেন? নাকি মাঝপথে ‘অন্য শক্তি’র ক্ষমতা দখলের আশঙ্কা করেন?
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, ‘কখন ‘অন্য শক্তি’ আসে? যখন রাজনীতি ব্যর্থ হয়। যখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। যখন নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। যখন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করে, কিন্তু মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক পরিসর কখনও শূন্য থাকে না।
সে জায়গা দখল করে অগণতান্ত্রিক শক্তি, সামরিক শক্তি, অথবা বিদেশি প্রভাবিত শক্তি।’ হাসিনা বলেন, ‘আমি চাই না, বাংলাদেশ আবার সেই অন্ধকার পথে যাক। আমি চাই না, বাংলাদেশের মানুষ আবার অনিশ্চয়তা, সামরিক হস্তক্ষেপ, উগ্রবাদ বা অদৃশ্য শক্তির রাজনীতির মধ্যে পড়ুক। আমি চাই জনগণের ভোটে, সংবিধানের পথে, সব দলের অংশগ্রহণে, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরে আসুক।
বন্দুকের জোর, মামলা-হামলা, নিষেধাজ্ঞা বা মব দিয়ে কিছু দিন ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, তার পরে সেটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। জনগণের আস্থা ছাড়া রাষ্ট্র চালানো যায় না।