বাংলাদেশ খুব শিগগিরই এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণ লাভ করতে যাচ্ছে : বাণিজ্যমন্ত্রী
মনিরুল ইসলাম: স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে যাওয়ার পর উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এর ফলে দেশের সম্ভাব্য সাড়ে ১৭ বিলিয়ন (১ হাজার ৭৫০ কোটি) মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যেই বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলেও জানান মন্ত্রী।
সোমবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য জানান। সভায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন।
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ খুব শিগগিরই এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণ লাভ করতে যাচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন উন্নত দেশের দেওয়া বিশেষ বাণিজ্য সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, যা আমাদের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইতিমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) স্বাক্ষরের আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো বড় বাজারগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা সেপা স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ি করেন। তিনি বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বৈরী পরিস্থিতি আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে চড়া মূল্য চোকাতে হওয়ায় এবং সেই তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হওয়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট রূপ নিয়েছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ২১.৫০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে ৭৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানির বিপরীতে দেশের রপ্তানি আয় ছিল ৫৫.১৯ বিলিয়ন ডলার।
মন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০২টি দেশ ও অঞ্চলে পণ্য রপ্তানি করা হলেও মোট আয়ের ৮৪ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একটি মাত্র খাতের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকেও সমান সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সেবা, হালকা প্রকৌশল, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক পণ্য, এই আটটি খাতের আংশিক রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের মাধ্যমে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা হচ্ছে এবং টেকসই রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে 'রপ্তানি নীতি ২০২৪-২০২৭' প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সাথে বিশ্ববাজারে অবস্থান শক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার কম সুদে প্রাক-জাহাজীকরণ ঋণ তহবিল এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণের ব্যবস্থা রেখেছে। রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সরকার 'কাগজ ও প্যাকেজিং' পণ্যকে ২০২৬ সালের 'বর্ষপণ্য' বা 'প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার' ঘোষণা করেছে।
এদিকে বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আলীমের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জোরদারের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভুটানের সাথে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির (পিটিএ) আওতায় ১০০টি বাংলাদেশি পণ্য এবং ৩৪টি ভুটানি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি করার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সেপা (ঈঊচঅ) চুক্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭.৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা সার্ক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া আফগানিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে বলে মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন। তবে এলডিসি পরবর্তী সময়ে বিশ্বমঞ্চে রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানান তিনি।