শিরোনাম
◈ বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ওয়ানডে সিরিজের ম্যাচ দেখা যা‌বে সর্বনিম্ম ২০০ টাকায়  ◈ ঝুঁকিতে বিশ্বের ১৫ দেশ: আগামী ৫০ বছরে হারিয়ে যেতে পারে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ◈ আপা ডাকায় নয়, পুরোনো বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি: সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশা ◈ শার্শায় আইনজীবী মিন্টুকে গ্রেফতারচেষ্টা, গ্রামবাসীর বাধায় ব্যর্থ পুলিশ ◈ বিদেশি বিনিয়োগ আনা বাংলাদেশিদের পুরস্কৃত করবে সরকার ◈ জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাথে চুক্তি ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে, ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হচ্ছে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ◈ ইন্টারপোল রেড নোটিশভুক্ত নজরুল ইসলাম লিবিয়ায় গ্রেফতার ◈ এই বিজয় বাংলাদেশ ও গণতন্ত্রের বিজয়: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ-হত্যা: যে কারণে স্বপ্না হঠাৎ স্বামী সোহেল রানাকে মারতে তেড়ে যান ◈ তোফায়েলের জানাজা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, মুখ খুললেন হাছান মাহমুদ

প্রকাশিত : ১১ মে, ২০২৬, ০২:২৫ রাত
আপডেট : ০১ জুন, ২০২৬, ০৬:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভুয়া সাইবার মামলা ঠেকাতে নতুন আইনে কঠোর ব্যবস্থা

সাংবাদিক, ব্লগার বা সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে সাইবার মামলা করে এখন আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেই ভুক্তভোগী আসামি সরাসরি মূল অভিযোগকারীর (বাদী) বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। এমনকি কেউ মামলা করিয়ে থাকলে বা মিথ্যা মামলায় সহায়তা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধেও মূল অপরাধীর সমান দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়— আদালত (ট্রাইবুন্যাল) স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই মামলা করতে পারবেন। 

গত ১০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’ বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে এই নতুন আইন পুনঃপ্রণয়ন করা হয়েছে। 

মিথ্যা মামলার প্রতিকারে ২৮ ধারা : নতুন আইনের ২৮ ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়েরের অপরাধ ও দণ্ডের বিধান স্পষ্ট করা হয়েছে।

সরাসরি মামলা: কোনও ব্যক্তি যদি অন্য কারও ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ন্যায্য কারণ ছাড়াই মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেন, তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তি সরাসরি ঐ বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন।

সমপরিমাণ দণ্ড: মিথ্যা মামলাকারী ব্যক্তি ঠিক সেই দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন, যা মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ যে ধারায় মিথ্যা অভিযোগ আনা হবে, বাদীকে সেই ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি ভোগ করতে হবে।

একাধিক ধারায় দণ্ড: যদি একাধিক ধারায় মিথ্যা মামলা করা হয়, তবে এর মধ্যে যে ধারার দণ্ড সবচেয়ে বেশি, সেটিই শাস্তি হিসেবে নির্ধারিত হবে।

সহায়তাকারীর সাজা: আইনের ২৭ ধারা অনুযায়ী, যদি কেউ মিথ্যা মামলা করতে সহায়তা করেন, তবে তিনিও মূল অপরাধীর সমান দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। 

ট্রাইব্যুনালের স্বতঃপ্রণোদিত ক্ষমতা : আইনের ২৮ (৩) উপধারা অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে বিচার শুরু করতে পারবে। দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মামলা করার ক্ষেত্রে আদালতের যে দীর্ঘসূত্রিতা বা অনুমতির বাধ্যবাধকতা ছিল, সাইবার সুরক্ষা আইনে সেই সীমাবদ্ধতা রাখা হয়নি। 

সংসদে উদ্বেগ ও সরকারের নিশ্চয়তা : বিলটি পাসের সময় কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ মুক্তমত দমনে এই আইনের অপব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও স্বাধীন সংস্থাগুলোর উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন। জাতীয় সংসদে লিখিত প্রশ্নে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর কাছে তিনি জানতে চান— বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে সাইবার সুরক্ষা আইন চালু হলেও সাংবাদিক, ব্লগার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এই আইনের অপব্যবহারের প্রমাণিত অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া, স্বাধীন সংস্থাগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। এই আইনটি মুক্তমত দমনে ব্যবহার না হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে সরকার কোনও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করবে কিনা? না করলে কী উপায়ে এই আইনের অপব্যবহার রোধের নিশ্চয়তা সরকার প্রদান করবে? 

জবাবে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, আইনের অপব্যবহার রোধেই ২৮ ধারায় বাদীর শাস্তির বিধান কঠোর করা হয়েছে। 

বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : সংশ্লিষ্টরা জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারার মতো এখানেও মিথ্যা মামলার বাদীর বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মানহানির মামলা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল ছিল। এখন বিশেষ এই আইনের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত হবে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়রা ও জেলা জজ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রচলিত দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘসূত্রতা থাকলেও সাইবার সুরক্ষা আইনের মতো বিশেষ আইনে সেই জটিলতা নেই। এই আইনে ট্রাইব্যুনাল কোনও লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা নিজস্ব ক্ষমতায় (স্বতঃপ্রণোদিতভাবে) মিথ্যা মামলাকারীর বিচার করতে পারেন। 

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পুরো মামলাটি মিথ্যা না হলেও যদি কোনও নিরপরাধ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আসামি করা হয় এবং তা আদালতে প্রমাণিত হয়, তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তি সরাসরি বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। এমনকি তদন্ত কর্মকর্তা যদি কাউকে অভিযোগ থেকে বাদ দেন, তবে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বাহাউদ্দিন ইমরান বলেন, “প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী মিথ্যা মামলার শিকার ব্যক্তি মানহানি বা ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারলেও ২১১ ধারায় বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৮ ধারায় এই সীমাবদ্ধতা নেই; এখানে ভুক্তভোগী সরাসরি মামলা করতে পারেন অথবা আদালত নিজেই ব্যবস্থা নিতে পারেন।” 

একই প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক পরিদর্শক রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সাধারণ ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তদন্তকারী কর্মকর্তার সুপারিশ এবং আদালতের সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করেই কেবল বাদীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন চাওয়া সম্ভব হয়। তবে সাইবার সুরক্ষা আইনের মতো বিশেষ আইনগুলোতে নিরপরাধ প্রমাণ হওয়া মাত্রই অভিযুক্ত ব্যক্তির সরাসরি আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ সহজ হয়েছে।

ব্লগার কিশোর পাশা ইমন বাক-স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব ভালো লাগা বা মন্দ লাগা প্রকাশের অধিকার রয়েছে। কোনও ব্লগারের লেখায় ধর্মীয় সমালোচনা থাকলেই তাকে ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত’ হিসেবে গণ্য করা যৌক্তিক নয়, কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিপ্রায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নাও হতে পারে।” 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রকৃতপক্ষে যারা সেই লেখাগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা ‘মব’ সংগঠিত করে, দায় তাদের ওপর বর্তানো উচিত। অথচ বাস্তবে মূল লেখককে গ্রেফতার করা হলেও উসকানিদাতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে।” তিনি প্রত্যাশা করেন, নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন যেন সাংবাদিক ও ব্লগারদের কণ্ঠরোধে ব্যবহৃত না হয়ে বরং মিথ্যা মামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়। 

কার্যকারিতা ও বিচার : আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ২০০৬ সালের সাইবার আপিল ট্রাইব্যুনালে এই সংক্রান্ত মামলার বিচার কাজ পরিচালিত হবে। এই আইনটি ২০২৫ সালের ২১ মে থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে।  উৎস: বাংলাট্রিবিউন।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়