শিরোনাম
◈ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নেই, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনাই অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ◈ আয়কর রিটার্ন দেয়া যাবে সারা বছর  ◈ বদলাতে হলো হাইতির বিশ্বকাপ জার্সি ◈ সঞ্চয়পত্র-ডিপিএসসহ ৯ খাতে বিনিয়োগে কর রেয়াত কমানোর ঘোষণা ◈ যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে  ◈ কমতে পারে যেসব পণ্যের দাম  ◈ বাজেট ২০২৬–২৭: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ১০ অগ্রাধিকার ◈ পোলট্রি ও ফিশ ফিডে বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য, বাড়ছে ক্যানসারসহ নানা রোগ, সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি! ◈ যে ছেলে একসময় টিফিনের টাকাও জোগাড় করতে পারত না, আজ দুবাইয়ে ২০ হাজার কোটির মালিক ◈ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা

প্রকাশিত : ১১ জুন, ২০২৬, ০১:২১ দুপুর
আপডেট : ১১ জুন, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

যে ছেলে একসময় টিফিনের টাকাও জোগাড় করতে পারত না, আজ দুবাইয়ে ২০ হাজার কোটির মালিক

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে: নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় রিয়েলিটি সিরিজ ‘দুবাই ব্লিং’–এ উপস্থিতির পর নতুন প্রজন্মের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছেন রিজওয়ান সাজান। কিন্তু ক্যামেরার ঝলকানি, বিলাসবহুল জীবন আর হাজার কোটি টাকার সম্পদের আড়ালে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম, ঝুঁকি আর অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়ের এক গল্প।

দুবাইয়ের ঝলমলে আকাশরেখার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ৪০ হাজার বর্গফুটের এক প্রাসাদ। বিশাল ফোয়ারা, ব্যক্তিগত সিনেমা হল, ক্যাসিনো-স্টাইল গেমিং লাউঞ্জ, সুইমিংপুল, স্পা, এমনকি ঘরের ভেতর খাবার ওঠানামার জন্য আলাদা লিফট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি কোনো রাজপরিবারের বাসভবন। অথচ এই বাড়ির মালিকের শৈশব কেটেছে মুম্বাইয়ের বস্তিতে।

যে ছেলেটি একসময় স্কুল ক্যানটিনে সমুচা কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারত না, সেই ছেলেই আজ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সফল ভারতীয় ব্যবসায়ী। তিনি রিজওয়ান সাজান—দুবাইভিত্তিক নির্মাণসামগ্রী ও রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ড্যানিউব গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা।

সমুচা কেনার টাকাই ছিল প্রথম স্বপ্ন

রিজওয়ান সাজানের জন্ম মুম্বাইয়ের ঘাটকোপার এলাকায় এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল নড়বড়ে। বাবা কষ্ট করে কনভেন্ট স্কুলের ফি দিতেন। মাসে হাতখরচ হিসেবে পেতেন মাত্র ১৫ রুপি। স্কুলের ক্যানটিনে সহপাঠীদের খাবার খেতে দেখতেন। কিন্তু নিজের পকেটে টাকা থাকত না। এই ছোট্ট অপমানই একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

পরে এক সাক্ষাৎকারে রিজওয়ান সাজান বলেছিলেন, ‘বন্ধুরা যখন ক্যানটিনে খেত, আমি দূর থেকে দেখতাম। খুব খারাপ লাগত। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, নিজের টাকা নিজেই আয় করব।’ মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি প্রথম ব্যবসা শুরু করেন।

বাবার কাছ থেকে ধার নেওয়া এক হাজার রুপি

ব্যবসা শুরু করার জন্য বাবার কাছ থেকে ধার নেন এক হাজার রুপি। সেই টাকা দিয়ে মুম্বাইয়ের পাইকারি বাজার থেকে স্কুলের বই কিনে মৌসুমে বিক্রি করতে শুরু করেন। হিসাব ছিল, ৭৫ রুপি লাভ হলেই রিজওয়ান খুশি। কিন্তু মৌসুম শেষে লাভ দাঁড়ায় ২০০ রুপি।

আজকের দিনে ২০০ রুপি তেমন কিছু নয়। কিন্তু তখন সেই অর্থ রিজওয়ান সাজানের কাছে ছিল বিশাল সম্পদ। মজার ব্যাপার হলো, প্রথম লাভের টাকা দিয়ে তিনি নিজের জন্য নয়, বন্ধুদের জন্য সমুচা কিনেছিলেন। যে সমুচা খাওয়ার জন্য ব্যবসা শুরু, সেই সমুচাই যেন হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রথম সাফল্যের প্রতীক।

এক মৌসুমে এক ব্যবসা

প্রথম লাভ রিজওয়ান সাজানকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেয়। স্কুলের বই বিক্রির পর রাখি উৎসবে রাখি বিক্রি করেছেন। দীপাবলিতে আতশবাজি বিক্রি করেছেন। কখনো আবার দুধ সরবরাহের কাজও করেছেন। একসময় দুধের ক্যান পড়ে যাওয়ায় চাকরি হারাতে হয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা তাঁকে নতুন কিছু শেখায়।

বাবার মৃত্যু, তারপর বিদেশযাত্রা

১৮ বছর বয়সে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে। মারা যান রিজওয়ান সাজানের বাবা। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। তখন কাজের খোঁজে পাড়ি জমান কুয়েতে। সেখানে মাসে ১৮ হাজার রুপি বেতনের চাকরি পান। যে ছেলেটি কয়েক বছর আগেও ১৫ রুপির হাতখরচে চলত, তাঁর কাছে এটি ছিল অবিশ্বাস্য এক অঙ্ক। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য আরও বড় পরীক্ষা জমিয়ে রেখেছিল।

যুদ্ধের মধ্যেও ব্যবসার সুযোগ

১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হলে কুয়েতে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। বিদেশে থাকা ভারতীয়রা নিজেদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। অনেকে আতঙ্কে ছিলেন—বাড়ির লোকজন জানে কি না তারা বেঁচে আছেন। এই সংকটের মধ্যেই রিজওয়ান একটি ব্যবসার সুযোগ দেখতে পান। নিজের পরিবারের কাছে টেলিগ্রাম পাঠাতে তাঁকে ইরাক যেতে হয়েছিল। তখন ভাবলেন, অন্যদের বার্তাও সঙ্গে নিয়ে গেলে কেমন হয়? প্রতি টেলিগ্রামের জন্য পাঁচ দিনার করে নেওয়া শুরু করেন। শত শত মানুষের বার্তা নিয়ে সামরিক চৌকি পেরিয়ে যাতায়াত করেছেন। ঝুঁকি ছিল, কিন্তু ছিল লাভও। যুদ্ধের সময় অনেকেই শুধু বাঁচার কথা ভাবছিলেন। রিজওয়ান তখনো সুযোগ খুঁজছিলেন। এই মানসিকতাই পরবর্তী জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।

দুবাইয়ে নতুন জীবন

কুয়েত অধ্যায়ের পর রিজওয়ান পাড়ি জমান দুবাইয়ে। তখন রিজওয়ানের সঞ্চয় ছিল প্রায় এক লাখ দিরহাম। এই অর্থও খুব পরিকল্পনা করে ভাগ করেছিলেন। স্ত্রীর হাতে সংসার চালানোর জন্য কিছু অর্থ দেন। একটি ছোট অফিস নেন। গাড়ি কেনেন কিস্তিতে। ব্যবসার লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য আলাদা তহবিল রাখেন। নিজেকে সময় দিয়েছিলেন মাত্র তিন মাস। প্রথম মাসে আয় হয় ৫ হাজার দিরহাম। দ্বিতীয় মাসে ১০ হাজার। তৃতীয় মাসে ২০ হাজার। তখনই বুঝেছিলেন, তাঁর ব্যবসা সঠিক পথে এগোচ্ছে।

ড্যানিউব সাম্রাজ্যের জন্ম

ধীরে ধীরে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ড্যানিউব গ্রুপ। আজ মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণশিল্পে অন্যতম পরিচিত নাম এই প্রতিষ্ঠান। বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল, হোম ইন্টেরিয়র, রিয়েল এস্টেট—বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসা। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। রিজওয়ানের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি রুপি। তবে তাঁর ভাষায়, ‘আমাকে কখনো টাকা অনুপ্রাণিত করেনি। কাজই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। টাকা শুধু সেই কাজের ফল।’

৪০ হাজার বর্গফুটের প্রাসাদ

আজ রিজওয়ান সাজানের বাসভবন দুবাইয়ের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিগত সম্পত্তি। বাড়ির প্রবেশপথেই বিশাল ফোয়ারা। ভেতরে রয়েছে বিশাল অ্যাকুয়ারিয়াম, সাদা গ্র্যান্ড পিয়ানো, ব্যক্তিগত থিয়েটার, স্পা, গেমিং জোন, ক্যাসিনো-স্টাইল লাউঞ্জ এবং শিশুদের জন্য বিশেষ প্লে-রুম। বাড়ির কিছু বাথরুমও যেন বিলাসিতার আলাদা সংজ্ঞা। একটিতে রয়েছে অ্যাকুয়ারিয়াম, রেইন শাওয়ার এবং আইস বাথ। তাঁর সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপন প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়। তবে এই বিলাসিতার মধ্যেও রিজওয়ান নিজের অতীত ভুলে যাননি।

‘আফ্রিকার জঙ্গলে ছেড়ে দিলেও আবার শুরু করব’

রিজওয়ানের সবচেয়ে আলোচিত উক্তিগুলোর একটি হলো—‘আমি বস্তিতে জন্মেছি। পরে চাওলে থেকেছি। আজ ৪০ হাজার বর্গফুটের বাড়িতে থাকি। কিন্তু আমাকে যদি আফ্রিকার কোনো জঙ্গলে কিছু না দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, আমি আবারও নিজেকে গড়ে তুলতে পারব।’ এই আত্মবিশ্বাসই তাঁর সাফল্যের মূল রহস্য। কারণ, তিনি জানেন, সম্পদ হারানো যায়; কিন্তু অভিজ্ঞতা, সাহস আর উদ্যোগ হারায় না।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়