যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি হলে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান কেট্রেড সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী দেশগুলোর একটি হতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়ও আসতে পারে।
অর্থনীতিতে ছয়টি বড় ইতিবাচক প্রভাব
কেট্রেড সিকিউরিটিজ পাকিস্তানের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ছয়টি প্রধান সুফলের কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
হরমুজ সংকটের বড় ক্ষতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশের সমান।
এছাড়া মে ২০২৬-এ দেশটির মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে চলতি হিসাব ঘাটতিতে চলে গেছে এবং এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদের হার ১০০ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
গুরুত্ব বাড়ছে গওয়াদার বন্দরের
আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে গওয়াদার বন্দরকে অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থানের কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে গওয়াদার বন্দরে কনটেইনার পরিবহন ১১ হাজার টিইইউতে পৌঁছেছে, যা আগের পুরো বছরের মোট পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে বন্দরটি থেকে বছরে ৫ থেকে ৮ কোটি ডলার রাজস্ব আয় হতে পারে। পাশাপাশি ট্রানজিট ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) সংশ্লিষ্ট আয়ও বাড়বে।
সৌদি আরব ইতোমধ্যে গওয়াদারে তেল সংরক্ষণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছে। দেশটি পাকিস্তানকে ২ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে এবং আরও ৩ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন সুযোগ
নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়ে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক করিডোর গড়ে উঠলে পাকিস্তান-ইরান বাণিজ্যের পরিমাণ স্বল্প সময়েই ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সিমেন্ট, তৈরি পোশাক, চাল, ফলমূল ও চিকিৎসাসামগ্রী রপ্তানির সুযোগ বাড়বে। অন্যদিকে ইরান থেকে জ্বালানি, রাসায়নিক পণ্য, প্লাস্টিক ও ইস্পাত আমদানি করা যেতে পারে।
ইরানের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে দেশটিতে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হলে পাকিস্তানের সিমেন্ট রপ্তানিও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্যাস পাইপলাইনে বছরে ২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
প্রতিবেদনে ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পকে পাকিস্তানের জন্য বড় কাঠামোগত সুবিধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমানে পাকিস্তান কাতার থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১৩ ডলারে আমদানি করে। বিপরীতে ইরানি পাইপলাইন গ্যাসের সম্ভাব্য মূল্য ৬ থেকে ৮ ডলারের মধ্যে হতে পারে।
প্রকল্পটি চালু হলে পাকিস্তান বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সৌদি বিনিয়োগ ও সিপিইসির সম্প্রসারণ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগ চুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ১৫ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার সৌদি বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পও উপকৃত হবে। ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে এ প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভবিষ্যতে ইরান সিপিইসিতে যুক্ত হলে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে আঞ্চলিক সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
এদিকে তেলের বৈশ্বিক দাম কমে গেলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে সুদের হার কমানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।