শিরোনাম
◈ পাহাড়ি অঞ্চলে সফল আর্লি ওয়ার্নিং মডেল: আগাম সতর্কবার্তায় কমছে প্রাণহানি, ভূমিধস মোকাবিলায় নতুন আশার আলো ◈ মার্কিন ভিসা আবেদনকারীদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ‘পাবলিক’ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ◈ মিথ্যা কাহিনি ও জাল কাগজে অ্যাসাইলাম, হাজারো আবেদন বাতিলের হুঁশিয়ারি ◈ ট্রাম্পের অকথ্য ভাষায় গালাগাল প্রসঙ্গে নেতানিয়াহুে এবার যা বললেন ◈ মধ্যপ্রাচ্যের যে ১৪ দেশে নতুন সতর্কতা জারি করল যুক্তরাষ্ট্র ◈ বি‌শ্বের নেতৃত্ব নি‌য়ে যুক্তরাস্ট্র, রা‌শিয়া ও চী‌নের ম‌ধ্যে রশি টানাটানি ◈ বিশ্বকাপের প্রস্তু‌তি, ফ্রান্স‌কে হারা‌লো আইভ‌রি কোস্ট, স্পেনকে রুখে দিলো ইরাক ◈ ৩০০ ফিটে ঝটিকা মিছিলের অভিযোগে যুবলীগ নেতা আটক ◈ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে আবারো তলিয়ে গেছে যাত্রীবাহী বাস (ভিডিও) ◈ নতুন সতর্কতায় ‘সুপার এল নিনো’, কোন সংকটে পড়তে পারে বিশ্ব?

প্রকাশিত : ০৫ জুন, ২০২৬, ০১:০২ দুপুর
আপডেট : ০৫ জুন, ২০২৬, ০২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দাউদ ইব্রাহিমের অনুকরণে বি-কম্পানি থেকে পলাশ গ্রুপ, সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বে জিম্মি খুলনা, দোয়া চায় ফেসবুকে

খুলনা নগরের প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়। এলাকাটি দিনের বেশির ভাগ সময় সরগরম থাকে। সেই ব্যস্ত জায়গাতেই গত ৪ মার্চ রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সবার চোখের সামনে দিয়ে চলে যায় খুনিরা। সূত্র: প্রথম আলো প্রতিবদেন

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে খুলনায় এভাবে প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা ও জখমের আলোচিত অর্ধশত ঘটনা ঘটেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ২২ মাসে খুলনা শহর ও জেলায় এমন ঘটনা দুই শতাধিক। বেশির ভাগ খুনোখুনির পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ ও পূর্বশত্রুতা রয়েছে বলে স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে।

সর্বশেষ খুনের ঘটনা ঘটে ২ জুন নগরের লবণচরা থানা এলাকার সাচিবুনিয়া স্কুলভিটা এলাকায়। দুপুর ১২টার দিকে কাজী রাশিদুল ইসলাম নামের এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হলেও যাঁকে দায়ী করা হচ্ছে, তিনি আলোচিত একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য। যিনি আড়াই মাস আগে নিহত যুবকের পরিবারের সদস্যদের গুলি করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

খুলনার অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে আটটি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। এখন তারা এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকায়ও খুনোখুনি করতে দ্বিধা করছে না। মানুষও প্রতিরোধে এগিয়ে আসার বা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও অদক্ষতার সুযোগেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কাগজে-কলমে সন্ত্রাসীদের তালিকা আছে। অভিযানও হয়। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। পুলিশের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার ও মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনের কথা জানানো হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধের নেপথ্যের ব্যক্তিরা ধরা পড়ে না। ফলে এক খুন থেকে আরেক খুনের পটভূমি তৈরি হয়।

খুলনার অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে আটটি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। এখন তারা এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকায়ও খুনোখুনি করতে দ্বিধা করছে না।

খুন বাড়ছে, মুখ খুলতেও ভয় মানুষের

গত পাঁচ বছরের পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় খুনের ঘটনা বেড়েছে। খুলনা মহানগর পুলিশের হিসাবে, ২০২১ সালে মহানগরে খুন হয় ১৫টি। ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি। এরপর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৯। ২০২৫ সালে হয় ৩৪। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসেই খুন হয়েছে ১৬টি।

মহানগরের বাইরেও একই চিত্র। খুলনা জেলায় ২০২১ সালে খুনের মামলা হয় ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি, ২০২৫ সালে ৪৯টি এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ২০টি।

১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পরও খুনোখুনি থামেনি। ফেব্রুয়ারিতে খুলনা শহরে খুন হয়েছে ৪টি, মার্চে ৪টি, এপ্রিলে ২টি ও মে মাসে ৫টি। এর বাইরে হত্যাচেষ্টার ঘটনাও আছে। গত ২১ মে বটিয়াঘাটা উপজেলার পুঁটিমারী বাজারে জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে ঢুকে গুলি করা হয়। এতে যুবদলের দুই কর্মী আহত হন।

খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর’ উল্লেখ করে মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম (মনা) বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নেই। প্রকাশ্যে মানুষকে খুন করা হচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে, গুলির ঘটনা ঘটছে, চাঁদাবাজি হচ্ছে। এগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।

বিএনপির নেতা বলেন, খুলনায় কিশোর গ্যাং ও মাদকের সিন্ডিকেট তৎপর হয়ে উঠেছে। বিষয়টি তাঁরা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার বলেছেন। কিন্তু পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

মানুষের নিরাপত্তা নেই। প্রকাশ্যে মানুষকে খুন করা হচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে, গুলির ঘটনা ঘটছে, চাঁদাবাজি হচ্ছে। এগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম

পুলিশের সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ ও এপ্রিলে ১৫ ধরনের অপরাধে দেশের ৮টি মহানগর পুলিশের ইউনিটের মধ্যে সর্বনিম্ন মামলা হয়েছে খুলনা মহানগরে—মার্চে ১০৫টি, এপ্রিলে ১১৪টি। স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, এই পরিসংখ্যান অপরাধের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না। অপরাধের সব ঘটনায় মামলা হয় না। এর পেছনে কাজ করে ভয়ের সংস্কৃতি।

মাসুম বিল্লাহকে হত্যার দুই মাস পর গত ১৩ মে হত্যার ঘটনাস্থল সেই জুতার দোকানে গেলে তিন কর্মীকে পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের কথা তুলতেই তাঁরা চুপ হয়ে যান। দোকানের ব্যবস্থাপক দীপঙ্কর বাহাদুর প্রথমে বলেন, তিনি ‘কিছুই দেখেননি’। অথচ সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাঁর সামনেই ঘটনাটি ঘটতে দেখা যায়। বিষয়টি বলতেই তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলা নিষেধ।’

খুলনায় নিহত ১১ জনের পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। তাঁরা পুরোনো মামলাগুলোর বিষয়ে কথা বলতেও ভয় পান।

হত্যাকাণ্ডের কথা তুলতেই তাঁরা চুপ হয়ে যান। দোকানের ব্যবস্থাপক দীপঙ্কর বাহাদুর প্রথমে বলেন, তিনি ‘কিছুই দেখেননি’। অথচ সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাঁর সামনেই ঘটনাটি ঘটতে দেখা যায়। বিষয়টি বলতেই তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলা নিষেধ।’

আদালতপাড়ায়ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই

মাসুম বিল্লাহ হত্যার তিন মাস আগে খুলনা জেলা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন নামের দুই ব্যক্তিকে। তাঁরা আদালতে মামলার হাজিরা দিয়ে বের হচ্ছিলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আদালতপাড়া ও ডাকবাংলোর ঘটনা দেখিয়েছে, খুলনায় জনসমাগম, এমনকি আদালতপাড়ায়ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না প্রশাসন।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, শহরের খুনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। এসব ঘটনায় খবর পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিহত ব্যক্তিদের কারও কারও সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও জানান কেএমপির কমিশনার।

সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চেহারা দেখিয়ে প্রচারণা চালালেও কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না—এ প্রশ্নে পুলিশের সক্ষমতার কিছুটা ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন কেএমপি কমিশনার। পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে তথ্য দেওয়া ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ আছে। তবে এ অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, শহরের খুনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। এসব ঘটনায় খবর পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
‘ভাই, আমাকে জানে মাইরেন না’

গত ৮ মে চারটি মোটরসাইকেলে চড়ে সন্ত্রাসীরা আজিজুল ইসলাম নামের এক যুবককে তুলে নেয়। সাচিবুনিয়া বাজার থেকে তাঁকে রাঙ্গেমারীর ভেতরের দিকে নেওয়া হয়। খুলনা নগরের জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় সোয়া চার কিলোমিটার দূরের এলাকাটি বটিয়াঘাটা, লবণচরা ও হরিণটানা থানার মিলনস্থল।

১১ মে ঘটনাস্থলে গিয়ে বোঝা যায়, আশপাশের মানুষের মধ্যে এখনো চাপা আতঙ্ক রয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। ঘটনার দিন দূর থেকে আজিজুলের আর্তচিৎকার শুনেছেন বলে জানান স্থানীয় তিন ব্যক্তি। তাঁদের ভাষ্য, আজিজুল তখন বলছিলেন, ‘ভাই, আমাকে জানে মাইরো না। আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে। আমি কিছু করি নাই।’ দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যাওয়ার আগে সন্ত্রাসীরা দুটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

নিহত আজিজুল খুলনা টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন রূপা পেট্রলপাম্পের পাশের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। সেই বাসার মালিক ফিরোজ আলম জানান, আজিজুল পেঁয়াজ-রসুনের ব্যবসা করতেন। ফুটপাতে বসে বিক্রি করতেন। হত্যার পর তাঁর স্ত্রী সীমা আক্তার দুই সন্তান নিয়ে তাঁর বাবার বাড়িতে উঠেছেন।

পরে সেই বাড়িতে গিয়ে সীমা আক্তারকে পাওয়া যায়। সীমা বলেন, আজিজুল পুরোনো লোকজন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ব্যবসা আর বাসাই ছিল তাঁর জীবন।

ঘটনার দিন দূর থেকে আজিজুলের আর্তচিৎকার শুনেছেন বলে জানান স্থানীয় তিন ব্যক্তি। তাঁদের ভাষ্য, আজিজুল তখন বলছিলেন, ‘ভাই, আমাকে জানে মাইরো না। আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে। আমি কিছু করি নাই।’
আজিজুলের শ্বশুর শেখ মুকুল হোসেন বলেন, তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। ঘটনার পর পুলিশ তাঁদের কাছে যায়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আজিজুলের বিরুদ্ধে ডাকাতি, হত্যাসহ সাতটি মামলা ছিল। ২০১৭-১৮ সালের দিকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি একটি পা হারান।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, তাঁর অতীত মামলা দিয়ে তাঁকে হত্যার ন্যায্যতা দেওয়া যায় না; বরং ঘটনাটি দেখায়, খুলনায় অপরাধী নেটওয়ার্ক থেকে বেরিয়ে আসার পরও কেউ প্রতিশোধের বাইরে থাকেন না। এমনই আরেক ঘটনা ঘটে গত ৪ মে। রাজু হাওলাদার (৩৮) নামের গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তিকে ঢাকায় নেওয়ার পথে রূপসার কুদির বটতলা এলাকায় অ্যাম্বুলেন্সে গুলি চালানো হয়। এই ঘটনাও সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্ব থেকেই হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো। রাজুর বিরুদ্ধেও হত্যা, ডাকাতিসহ একাধিক মামলা আছে। লবণচরা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে চারটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।

সন্ত্রাসী ৯টি গ্রুপ নিয়ে বেশি আলোচনা

সন্ত্রাসী দলগুলোর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন ও তাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, এমন আটজন এবং এখনো যোগাযোগ রয়েছে, এমন তিনজনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে এই প্রতিবেদক।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, খুলনা মহানগর ও জেলায় এখন ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত। এগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এর বাইরে দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ এলাকায় ছোট ছোট কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে।

এসব গ্রুপের কিছু মাদক ও অস্ত্র কারবারকেন্দ্রিক। কিছু স্থানীয় আধিপত্য, জমি, ঘের, ঘাট, পরিবহন বা ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। দৌলতপুর-মহেশ্বরপাশা এলাকায় পুরোনো চরমপন্থী ধারার সন্ত্রাসীদের কিছু উত্তরাধিকারও আছে।

খুলনা মহানগর ও জেলায় এখন ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত। এগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ।

দাউদ ইব্রাহিমের অনুকরণে ‘বি-কোম্পানি’

খুলনার সাম্প্রতিক অপরাধজগতে সবচেয়ে আলোচিত নাম গ্রেনেড বাবু। তাঁর আসল নাম রনি চৌধুরী ওরফে বাবু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০০৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের গাড়িতে গ্রেনেড হামলার পর থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে ‘গ্রেনেড’ শব্দটি জুড়ে যায়। এখন তিনি সন্ত্রাসী গ্রুপটির নাম দিয়েছেন ‘বি-কোম্পানি’। মুম্বাইভিত্তিক অপরাধজগতের ‘ডন’ দাউদ ইব্রাহিমের বাহিনীর নাম ‘ডি কোম্পানি’। সেই অনুকরণে বি-কোম্পানি নামকরণ বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এই সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের নেতা নিজেকে ‘নবাব’ নামেও পরিচয় দেন। তিনি বিদেশে বসে সন্ত্রাসী দলটি পরিচালনা করেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশেই গ্রেনেড বাবুর লোকজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। খুলনা মহানগরের বিভিন্ন থানায় গ্রেনেড বাবুর নামে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মারধরসহ বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১৭টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা সূত্রগুলো বলছে, বি-কোম্পানির রয়েছে বিভিন্ন স্তরভিত্তিক অপরাধী নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েক শ সদস্য কাজ করে এই চক্রের সঙ্গে। এদের বড় অংশ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। শীর্ষ নেতৃত্বের নিচে আছে সেকেন্ড ইন কমান্ড, ক্যাশিয়ার, শুটার, মোটরসাইকেল বাহিনী, মাদক বিক্রেতা, কিশোর গ্যাং, তথ্যদাতা, আইনি সহায়তাকারী ও সামাজিক প্রচারণাকারী। অনেক সদস্যকে মাসে ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয়। কাউকে মোটরসাইকেল, কারও হাতে অস্ত্র, আবার কর্মহীন তরুণ ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে মাদক তুলে দেওয়া হয় বিক্রির জন্য।

মুম্বাইভিত্তিক অপরাধজগতের ‘ডন’ দাউদ ইব্রাহিমের বাহিনীর নাম ‘ডি কোম্পানি’। সেই অনুকরণে বি-কোম্পানি নামকরণ বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এই সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের নেতা নিজেকে ‘নবাব’ নামেও পরিচয় দেন।
গত বছরের ৭ জুন গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, গুলি, নগদ অর্থ ও নথি উদ্ধার করেছে। তবে তাঁকে ধরতে পারেনি। তিনি আত্মগোপনে থেকে বিদেশি ফোন নম্বরের মাধ্যমে দল পরিচালনা ও অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি বা অর্থসংক্রান্ত সমস্যা মেটাতেও এখন অনেকে বি–কোম্পানির কাছে যায়। শামসুর রহমান রোড, শেখপাড়া, আদালতপাড়া ও ডাকবাংলো এলাকায় বি–কোম্পানির নেটওয়ার্ক সবচেয়ে শক্তিশালী। যদিও এই সন্ত্রাসী দলের প্রভাব এখন পুরো খুলনায় বিস্তৃত হয়েছে।

বাবু-পলাশ দ্বন্দ্ব

গ্রেনেড বাবুর পাশাপাশি আরেক আলোচিত নাম শেখ পলাশ। তিনি একসময় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পলাশ খুলনায় ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। মিস্ত্রিপাড়া, বানরগাতি, আরামবাগ, নিরালা, পশ্চিম বানিয়াখামার, রূপসা বাগমারা ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় তাঁর প্রভাব ছিল বেশি। এ সময় বাবু ও পলাশ ছিলেন ‘সমানে সমান’। অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একজন আরেকজনের অনুসারীকে খুন করতে থাকেন। একপর্যায়ে বাবু কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।

২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চার ঘণ্টার অভিযানে যৌথ বাহিনীর হাতে খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে ১০ সহযোগী এবং অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন শেখ পলাশ। সেদিন তাঁর দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলিও হয়। পলাশ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাবু আবার অপরাধজগতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। ৩০ নভেম্বর আদালত চত্বরে যে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, তাঁরা পলাশের অনুসারী ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।

দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব কারাগারেও পৌঁছেছে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর কারাগারে দুই গ্রুপের সদস্যরা সংঘর্ষে জড়ায়। পরে লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয় বলে খুলনা কারাগার সূত্র জানিয়েছে।

অপরাধজগতে আরও যারা

স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টুটপাড়া, মহিরবাড়ি ও তালতলা এলাকায় নূর আজিম গ্রুপ এবং চানমারী, শিপইয়ার্ড রোড ও সাচিবুনিয়া এলাকায় আশিক বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। আশিকের উত্থান কিশোর গ্যাং থেকে। এ ছাড়া লবণচরা-জিন্নাহপাড়া এলাকায় শাকিল গ্রুপ, দৌলতপুর, মহেশ্বরপাশা, দেয়ানা ও তেলিগাতি এলাকায় হুমা, আরমান ও নাসিমুল গণির নাম বেশি আলোচিত।

খুলনার অপরাধজগতের বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন একাধিক সূত্র বলছে, এখানকার অপরাধজগতের আরও কিছু মেরুকরণ হয়েছে। যেমন হুমা গ্রুপ এখন বি–কোম্পানির সঙ্গে মিলেমিশে অপরাধে জড়াচ্ছে। আবার পলাশের সঙ্গে যোগ দিয়েছে আশিক বাহিনীর সদস্যরা। সম্প্রতি তিনটি ঠিকাদারি কাজে বাধা দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি অপরাধের ঘটনায় দুই গ্রুপের সম্মিলিত অপরাধের তথ্য পাওয়া গেছে।

ফেসবুকে সন্ত্রাসীদের প্রচারণা

সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো খুলনায় এতটা নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালায়। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর এমন অন্তত ১৩টি ফেসবুক পেজ ও আইডির খোঁজ পেয়েছে প্রথম আলো। এসব পেজ থেকে বিভিন্নজনকে ইঙ্গিত করে খুনের হুমকি ও প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে নানা পোস্ট দেওয়া হয়। সন্ত্রাসী গ্রুপের নামে পোস্টার টাঙিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জড়ো হয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে পোস্ট করা হয়। সর্বশেষ ঈদুল আজহাতেও এমন প্রচারণা দেখা গেছে। এসব ঘটনায় সবার চেহারা স্পষ্ট হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশকে নির্বিকার ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বি–কোম্পানির ফেসবুক পেজে ঘোষণা দেওয়া হয়, খুলনার ১ নম্বর কাস্টম ঘাটে সাধারণ যাত্রীদের পারাপারের টোল বা ইজারার টাকা মওকুফ করা হয়েছে। আবার গত ২১ মে ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদের সময় ওই গ্রুপ ফেসবুকে ঘোষণা দেয়, ‘সঠিক তথ্যপ্রমাণসহ যদি কোনো ধর্ষণকারীকে খুলনায় শনাক্ত করা হয়, আমরা কথা দিচ্ছি, বি–কোম্পানির আদালতে তাঁকে সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।’

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কথিত সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করে বি–কোম্পানি। খুলনার শিববাড়ী মোড়ে গত এপ্রিল মাসে রীতিমতো বি–কোম্পানির নামে ব্যানার টানিয়ে গরমের মধ্যে ঠান্ডা পানি বিতরণ করা হয়। এ ঘটনার ভিডিও সন্ত্রাসী গ্রুপটির বিভিন্ন ফেসবুক পেজে প্রচার করে। এর আগে গত রমজানে গরিবদের মধ্যে ইফতারি এবং ঈদসামগ্রী বিতরণ করে সেটা ফেসবুক পেজে প্রচার করেছিল বি-কোম্পানি। এসব প্রচারণায় প্রায়ই দেখা যায় একটি বাক্য, ‘দোয়া মে ইয়াদ রাখনা’।

সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর এমন অন্তত ১৩টি ফেসবুক পেজ ও আইডির খোঁজ পেয়েছে প্রথম আলো। এসব পেজ থেকে বিভিন্নজনকে ইঙ্গিত করে খুনের হুমকি ও প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে নানা পোস্ট দেওয়া হয়।

এসব পোস্টের নিচে আবার বিপরীত পক্ষ মন্তব্যও করছে। যেমন ‘দাদাভাই এর হায়না’ নামক একটি পেজ থেকে লেখা হয় ‘পোলাপানের হাতে ইয়াবা তুলে দিয়ে এখন সরবত খাওয়াচ্ছে।’ গ্রেনেড বাবুর বিরোধী গ্রুপ পলাশের পক্ষে বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হয় ‘দাদাভাই এর হায়না’ নামক ফেসবুক পেজ থেকে।

স্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করেন, এসব তৎপরতা এলাকায় উপস্থিতি জানান দেওয়ার কৌশল। যারা নিয়মিত খুনোখুনি করছে, তারাই আবার সামাজিক কাজের ছবি ছড়ায়। এতে দরিদ্র মানুষের একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়; অপর দিকে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নানাভাবে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করার সুযোগ পায়।

জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগরের আমির মাহফুজুর রহমান বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাং—সব মিলিয়ে কাজ করছে। তাঁর ভাষায়, প্রশাসন এসব জানে না—বিষয়টি এমন নয়। কোথায় মাদকের আসর বসে, কারা চাঁদাবাজি করে, কারা ফুটপাত দখল করে রেখেছে—এসব বিষয় প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে। কিন্তু গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, সন্ত্রাসীরা এখন সামাজিক কর্মকাণ্ডের নামে বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়ে, পানি বিতরণ করে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করছে।

অস্ত্র ও ভাড়াটে খুন

খুলনার অপরাধজগতের সদস্যরা ঢাকা, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় গিয়েও ভাড়ায় খাটছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে। গত মার্চে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় রাকিবুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় খুলনার সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা হয়েছিল বলে ডিএমপির তদন্তে উঠে এসেছে।

ডিএমপির রমনা বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেন, রাকিবুল হত্যার দিন ৮–১০ জনের একটি দল ঘটনাস্থলে এসেছিল। তারা খুলনার বি কোম্পানির সদস্য। তাঁর ভাষ্য, এরা মূলত ভাড়ায় খাটা সন্ত্রাসী; টাকার বিনিময়ে নির্দেশ পেলে হামলা বা হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এর আগেও এমন বহু ঘটনায় তারা জড়িত ছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, খুলনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সীমান্ত হয়ে আসা অস্ত্র এখন খুলনা হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে বলেও জানা গেছে। খুলনা মহানগর পুলিশ ২০২৪ সালে ২৪টি এবং ২০২৫ সালে ৪৭টি অস্ত্র উদ্ধার করে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কেএমপি ১৭টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। একই সময়ে জেলা পুলিশ উদ্ধার করেছে ১৪টি অস্ত্র।

গত ৭ মার্চ রূপসা সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তল্লাশিতে সাতক্ষীরার এক নারীর কাছ থেকে ২টি রিভলবার, ৩টি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন ও ৯৬টি গুলি উদ্ধার হয়। কর্মকর্তারা জানান, ওই নারী সাতক্ষীরা থেকে অস্ত্র নিয়ে খুলনা হয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। কেএমপির তালিকাতেই এখন ১৮১ জন সন্ত্রাসীর নাম আছে। এদের বড় অংশ অস্ত্রধারী বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের খুলনা জেলা সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, পুলিশ জানে এসব অপরাধী কারা। কিন্তু আগে থেকে ব্যবস্থা নেয় না। অপরাধ ঘটার পরে পুলিশ তৎপরতা দেখায়।

স্থানীয় ব্যক্তিদের বড় অভিযোগ—অভিযানের আগেই অনেক সময় সন্ত্রাসীরা খবর পেয়ে যায়। পুলিশের ভেতরেও সন্ত্রাসীদের ‘ইনফরমার’ (তথ্যদাতা) আছে।

অভিযান আছে, আস্থা নেই

খুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বারবার অভিযানের কথা জানিয়েছে। সন্দেহভাজন গ্রেপ্তারও করেছে। তবে অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও আশ্রয়দাতারা ধরা পড়ছেন কম। কেউ ধরা পড়লেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধজগতে সক্রিয় হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতেও ভয় পায়। আদালতে গেলে অনেক মামলায় সাক্ষী পাওয়া যায় না।

স্থানীয় ব্যক্তিদের বড় অভিযোগ—অভিযানের আগেই অনেক সময় সন্ত্রাসীরা খবর পেয়ে যায়। পুলিশের ভেতরেও সন্ত্রাসীদের ‘ইনফরমার’ (তথ্যদাতা) আছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু  বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে খুনোখুনি শুরু হয়েছে, এমন পরিবেশ চরমপন্থীদের সময়েও ছিল না। সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে খুন করছে, চেহারাও দেখা যাচ্ছে, অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ছে না। মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

ডাকবাংলো মোড়ের ঐতিহ্যবাহী রহমানিয়া হোটেলে ১৯৮৭ সাল থেকে কাজ করেন মো. শহীদুল ইসলাম। তাঁর স্মৃতিতে খুলনার বহু রূপ জমা আছে। তিনি বলেন, এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর খুলনার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মানুষের নিরাপত্তা নেই। যখন যাকে খুশি গুলি করে, কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘খুলনা এখন আতঙ্কের শহর।’

খুলনার মানুষের এই আতঙ্ক শুধু খুনের নয়; এটি নীরবতার আতঙ্ক। মানুষ জানে, কিন্তু বলে না। দেখে, কিন্তু সাক্ষ্য দেয় না। আর সেই নীরবতার মধ্য দিয়েই খুলনার অপরাধী নেটওয়ার্ক প্রকাশ্যে দোয়া চেয়ে, ফেসবুকে প্রচারণা চালিয়ে আবার নতুন খুনের প্রস্তুতি নেয়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়