শিরোনাম
◈ পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ-হত্যা: যে কারণে স্বপ্না হঠাৎ স্বামী সোহেল রানাকে মারতে তেড়ে যান ◈ তোফায়েলের জানাজা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, মুখ খুললেন হাছান মাহমুদ ◈ ন‌ভেম্ব‌রে ঢাকায় পুরুষ‌দের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল, থাক‌বে‌ ভিআরএস প্রযু‌ক্তি  ◈ হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন ইসরায়েলি শীর্ষ কর্মকর্তা ◈ ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ◈ নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফে অসন্তোষ, বিইআরসিকে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ মন্ত্রণালয়ের ◈ ‘আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’, মায়ের মৃত্যু নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন নিহতের ছোট ছেলে বুয়েট অধ্যাপক ◈ কুমির সরিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি, মাজারের দিঘিতে ফেরত চাইলেন খাদেম ◈ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বকাপ মোবাইলে খেলা দেখবেন যেভাবে ◈ ইরান অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা, আর ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র: রুবিও

প্রকাশিত : ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:৪৩ দুপুর
আপডেট : ২৯ মে, ২০২৬, ০৪:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শেখ হাসিনার ‘একযোগে প্রকাশিত’ ভারতীয় সাক্ষাৎকারে প্রশ্নের ঝড়: সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক

হঠাৎ করেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একযোগে প্রচারিত ভারতের গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারগুলোকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। সাংবাদিকতার নৈতিকতা, রাজনৈতিক বার্তা এবং আঞ্চলিক শক্তির পালাবদল—সবকিছুই নতুন করে প্রশ্নের মুখে এসেছে তার সাজা ঘোষণার আগ মুহূর্তে। 

ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার সময়টাতে ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। রায়ের আগের ১২ দিনের (৭ থেকে ১৭ নভেম্বর) মধ্যে– যেন ঠিক একই ধাঁচে ভারতের পাঁচটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিক (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস), এনডিটিভি অনলাইন, শীর্ষ বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রশ্নোত্তরধর্মী সাক্ষাৎকার ছাপায়।

প্রত্যেকেই দাবি করে, এটি তাদের ‘এক্সক্লুসিভ’ সাক্ষাৎকার! যদিও প্রশ্ন ও উত্তরের শব্দচয়ন থেকে বিন্যাস, সব প্রায় একই। প্রশ্ন উঠেছে, এটি পরিকল্পিত নাকি কাকতালীয়?

সংবাদমাধ্যমগুলো অবশ্য জানায়, হাসিনা তাদের প্রশ্নের লিখিত জবাব পাঠিয়েছেন। একটি পত্রিকা লিখল, তিনি নাকি দিল্লির ‘গোপন শেল্টার’ থেকে যোগাযোগ করেছেন। আর অন্যরা বলল, ‘অজ্ঞাত স্থান’ থেকেই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। নিজেদের গুরুত্ব বোঝাতে সবাই দাবি করল– হাসিনা নাকি বাংলাদেশ ছাড়ার পর এটিই ‘প্রথম’ গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো– দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একই দিনে (৭ নভেম্বর) সাক্ষাৎকারটি ছাপে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজার ছাপে ১৩ নভেম্বর, তার আগের দিন পিটিআই। এনডিটিভি অনলাইন ও দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া প্রকাশ করে ১৭ নভেম্বর। অর্থাৎ ভারতের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমে ১২ দিনে আট-আটটি বড় সাক্ষাৎকার, এমন এক নেত্রীকে ঘিরে, যিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়েন এবং নিজ দেশের মানুষের ক্ষোভ এড়াতে ভারতে লুকিয়ে আছেন। এটি যে পরিকল্পিত ছিল এবং প্রচুর খরচে সাজানো হয়েছিল, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

আমি বলছি না যে সাক্ষাৎকার নেওয়া সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমগুলো ঘুষ খেয়েছে। কিন্তু যে জনসংযোগ–লবিং প্রতিষ্ঠান এত নিখুঁতভাবে এই প্রচার অভিযান সাজিয়েছে, বর্ণনা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারা নিশ্চয়ই মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক পেয়েছে। সেটা কার কাছ থেকে– তা অনুমান করতে খুব বেশি মাথা খাটানোর দরকার পড়ে না।

আমার আপত্তি অন্য জায়গায়। শেখ হাসিনাকে নিজের বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ায় আমার আপত্তি নেই– তিনি তাঁর বর্তমান অবস্থায় যতটা পেরেছেন, বলেছেন। প্রত্যাশিতভাবেই তিনি গণহত্যার দায় এড়িয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে দোষারোপ করেছেন, জুলাই–আগস্ট ২০২৪– এর তরুণ নিহতদের দায় নিজের নয় বলে দাবি করেছেন, নোবেলজয়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূসকে বিদেশি শক্তির সহায়তায় ক্ষমতা দখলের অভিযোগ করেছেন, বলেছেন আগামী বছরের নির্বাচন অর্থহীন– কারণ আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে না, বলেছেন তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের হিন্দুরা ‘অনাথ’, আরও বলেছেন জামায়াতে ইসলামী ফিরতি উত্থানের ফলে ‘উগ্র ইসলামপন্থার’ পুনরুত্থান নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে। আর অবশ্যই দিল্লিকে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাকে আশ্রয় দিয়ে ‘অকুণ্ঠ সমর্থন’ দেওয়ার জন্য।

এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। সমস্যা হলো– কেউ তাঁকে সেই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করেনি, যা একজন সাংবাদিকের অবশ্যই করার কথা। যা করলেই বোঝা যেত এটি সাংবাদিকতা, নাকি বিজ্ঞাপনধর্মী প্রচার।

যে প্রশ্নগুলো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো অজানা কারণে তাঁকে করেনি, অথচ যেগুলো করার এক সুবর্ণ সুযোগ ছিল, সেগুলো হলো–

১. ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আপনাকে ভারতে ঢোকার ‘সবুজ সংকেত’ কে দিয়েছিল? আপনি কি দিল্লিকে এসওএস পাঠিয়েছিলেন, নাকি দিল্লি থেকেই আপনাকে আসতে বলা হয়েছিল? নাকি আগেই কোনো সতর্কবার্তা ছিল, যাতে দেশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আপনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হবে?

২. নরেন্দ্র মোদি, এস. জয়শঙ্কর ও অজিত দোভালের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে কি? তাঁরা আপনাকে কী আশ্বাস দিয়েছেন?

৩. ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট জয়শঙ্কর পার্লামেন্টে বলেন, ‘খুব অল্প সময়ের নোটিশে’ আপনি ‘কিছু সময়ের জন্য’ ভারতে থাকার অনুমতি চান। অর্থাৎ প্রথমে আপনাকে কেবল অস্থায়ীভাবে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। সেই ‘কিছু সময়’ কীভাবে প্রায় ১৬ মাসে দাঁড়াল? আপনি কি অন্য দেশে যেতে কোনো অনুমতির অপেক্ষায় আছেন? যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং তা নাকি প্রত্যাখ্যান হয়েছে– এটা কি সত্য?

৪. দিল্লি আপনাকে ঠিক কী পরামর্শ দিয়েছিল পরিস্থিতি সামাল দিতে? জয়শঙ্কর ২২ মার্চ ২০২৫– এ পররাষ্ট্র বিষয়ক পার্লামেন্টের কমিটিতে বলেন– বাংলাদেশে ‘হাসিনাবিরোধী’ ঢেউ তৈরি হচ্ছে ভারত জানত, কিন্তু পরামর্শ ছাড়া আর কিছু করার অবস্থায় ছিল না। তখন আপনার অবস্থার মূল্যায়ন কি ভারতের মূল্যায়ন থেকে ভিন্ন ছিল?

৫. আপনাকে নাকি মাত্র আধা ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিল গণভবন ছাড়তে এবং হেলিকপ্টারে ওঠার আগে লাগেজ গোছাতে। আপনার কি কোনো পোষা বিড়াল বা কুকুর ছিল? তারা কি পরে আপনার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, নাকি এখনো সেখানেই আটকা পড়ে আছে?

৬. ১৯৭৫ সালের পর দিল্লিতে যে আপনার নির্বাসনকাল ছিল, তার সঙ্গে বর্তমান নির্বাসনের তুলনা কী? আপনার প্রতিদিনের জীবন কেমন কাটছে? বয়স বিবেচনায় দিল্লির দূষণ ও আপনার হাঁপানির সমস্যা কীভাবে সামলাচ্ছেন?

এসব খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন– একজন নতুন রিপোর্টারও এমন একটা প্রেক্ষাপটে করত। কারণ হাসিনার আকস্মিক পালিয়ে যাওয়া, তাঁর অবস্থান নিয়ে রহস্য, ভারতে তাঁর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা– এসবই বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন, যা গণমাধ্যমের পেশাদার অনুসন্ধান দাবি করে। কিন্তু দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রবিষয়ক সাংবাদিকেরা সেগুলো করলেন না, যদিও তাঁরা জানেন– আজ শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির এক বড় ঘুঁটি।

গেল ১২ নভেম্বর বাংলাদেশে একপ্রকার সাড়া পড়ে যায় এই সাক্ষাৎকারের কারণে। ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার পবন বাদেকে তলব করে ঢাকায় বলা হয়– ভারত নাকি হাসিনাকে ভারতীয় গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে, যদিও তিনি পলাতক। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক সাংবাদিক ও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্র শফিকুল আলম ভারতীয় সাংবাদিকদের ‘বুটলিকার বা পা-চাটা’ বলে মন্তব্য করলে প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইতে বলে।

বিশিষ্ট নিকারাগুয়ান সাংবাদিক ফাব্রিস লে লৌস প্রশ্নোত্তরভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রবল সমর্থক। তাঁর মতে, একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিয়ে এমন সাক্ষাৎকার তখনই মূল্যবান হয়, যখন সাংবাদিক পাঠকের হয়ে সেই প্রশ্নগুলো করেন, যা সত্য উদঘাটন করে এবং ভবিষ্যতের দলিল হয়ে উঠতে পারে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারগুলো এতটাই দুর্বল, তোষামোদপূর্ণ ও অপর্যাপ্ত যে সেগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে ভুলে যাওয়াই ভালো।

লেখক: ভারতের একজন সাংবাদিক এবং ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ। লেখাটি ভারতীয় সাময়িকী আউটলুক থেকে অনুবাদ করেছেন তামান্না–ই–জাহান। 

অনুবাদ: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়