বিবিসি : দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে। তবে এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন সেই আধিপত্য ভাঙতে উঠেপড়ে লেগেছে। বেইজিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস এবং বিশেষ করে এসব প্রযুক্তির প্রাণশক্তি- উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ উৎপাদনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। গত মাসে এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং সতর্ক করে বলেন, “চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের চিপ উন্নয়ন থেকে মাত্র ‘ন্যানোসেকেন্ড’ পিছিয়ে।”
২০২৪ সালে তুলনামূলক অপরিচিত চীনা স্টার্টআপ ডিপসিক যখন ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি-র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকাশ করে, তখন গোটা টেক দুনিয়ায় আলোড়ন পড়ে। অল্প খরচে এবং কম সংখ্যক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ ব্যবহার করেই তারা এই এআই মডেল তৈরি করে। এর ঘোষণার পর এনভিডিয়ার বাজারমূল্য সাময়িকভাবে কমেও যায়।
এরপর থেকেই চীনের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্ট করে জানিয়েছে- তারা এখন নিজস্ব চিপ তৈরি করে এনভিডিয়ার বিকল্প হতে চায়।
আলিবাবা ও হুয়াওয়ের চিপ বিপ্লব : চীনের সরকারি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসে আলিবাবা এমন একটি নতুন চিপ ঘোষণা করেছে, যা এনভিডিয়ার এইচ২০ প্রসেসরের সমান পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম- এমনকি কম শক্তি ব্যবহার করেও।
হুয়াওয়ে-ও তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী চিপ উন্মোচন করেছে এবং তিন বছরের মধ্যে এনভিডিয়ার এআই বাজারে প্রভাব কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা নিজেদের চিপ ডিজাইন ও সফটওয়্যার দেশের ভেতর উন্মুক্ত করে দেবে, যাতে স্থানীয় কোম্পানিগুলো মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্থান : অন্যান্য চীনা কোম্পানিও এখন বড় বড় চুক্তি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মেটা এক্স চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম কোম্পানি চায়না ইউনিকম-এ উন্নত চিপ সরবরাহ করছে। আরেক সম্ভাবনাময় প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যামব্রিকন টেকনোলোজিস, যার শেয়ার গত তিন মাসে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে- বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করছেন সরকার স্থানীয় চিপ ব্যবহারে জোর দেবে। এছাড়া উইচ্যাটের মালিক প্রতিষ্ঠান টেনসেন্ট ইতোমধ্যে চীনা চিপ ব্যবহারের সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়েছে।
চীনের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা : এনভিডিয়ার প্রধান হুয়াং স্বীকার করেছেন, চীনের প্রযুক্তি খাত অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং দক্ষ মানবসম্পদে সমৃদ্ধ। তিনি বলেন, ‘এটি একটি উদ্যমী, আধুনিক শিল্প। যুক্তরাষ্ট্রকে বাঁচতে হলে প্রতিযোগিতা করতেই হবে’।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের চিপ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে- বিশেষ করে জটিল ডেটা বিশ্লেষণমূলক কাজে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী জাওয়াদ হাজ-ইয়াহিয়া বলেন, “চীনা চিপের পারফরম্যান্স এখন প্রেডিকটিভ এআই-তে প্রায় সমান, তবে জটিল অ্যানালিটিক্সে এখনও পিছিয়ে। ফারাকটা কমছে, কিন্তু তা পূরণ হতে সময় লাগবে।”
‘বার্গেনিং চিপ’ হিসেবে চীনের পদক্ষেপ : বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাম্প্রতিক এসব ঘোষণা কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শুল্কযুদ্ধেও এক ধরনের কূটনৈতিক কৌশল।
চীন দেখাতে চায়, তারা স্বনির্ভর হতে চলেছে- তবে বাস্তবে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ার রাঘবেন্দ্র আনজনাপ্পা বলেন, ‘কম উন্নত টুলে চীন স্বাধীন হতে পারবে, কিন্তু জটিল এআই সিস্টেম প্রশিক্ষণে মার্কিন চিপের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে’।
যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণ চীনের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমান গতিতে চললে চীন হয়তো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই উচ্চমানের চিপ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। অনুবাদ: দৈনিক ইনকিলাব