শিরোনাম
◈ মমতার বিস্ফোরক মন্তব্যেও নীরব দিল্লি, বক্তব্য নেই বিজেপির ◈ মরুভূমির দেশ হয়েও কেন বালু আমদানি করে সৌদি আরব? ◈ মাত্র ১৭০ টাকায় অনলাইনে এনআইডি বিক্রি! ◈ বাড়তি মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ◈ শেখ হাসিনার পক্ষের দাবি নাকচ, জুলাই অভ্যুত্থান প্রতিবেদনের পাশে জাতিসংঘ ◈ কারামুক্ত হলেন সাবেক মেয়র আইভী ◈ দিল্লির আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত ২১; আহতদের মধ্যে ৫ বাংলাদেশি ◈ ‘আসল’ তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ঋতব্রতের হাতে, মমতাকে উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব ◈ অস্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে বাংলা‌দে‌শের ওয়ান‌ডে দল ঘোষণা, মিরাজ অ‌ধিনায়ক ◈ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ তুলে নিল সরকার

প্রকাশিত : ০৮ মে, ২০২৬, ০৭:২১ বিকাল
আপডেট : ০২ জুন, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

এফডিআরের বদলে এখন ট্রেজারি বিল-বন্ডে ঝুঁকছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা

ব্যাংকের আমানত, এফডিআর কিংবা সঞ্চয়পত্র— দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের প্রধান ভরসা ছিল এসব খাত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আসছে সরকারি সিকিউরিটিজ বা ট্রেজারি বিল-বন্ড এবং ইসলামিক বিনিয়োগপণ্য সুকুক। তুলনামূলক নিরাপদ, বাজারভিত্তিক মুনাফা এবং সরকারের প্রত্যক্ষ গ্যারান্টি থাকায় এসব বিনিয়োগে ধীরে ধীরে বাড়ছে সাধারণ মানুষের আগ্রহ।

বিশেষ করে যাদের অলস টাকা পড়ে আছে, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজারে যেতে চান না কিংবা সঞ্চয়পত্রের সীমাবদ্ধতায় বিকল্প খুঁজছেন— তাদের জন্য ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও সুকুক হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও বাজারভিত্তিক করতে সরকার এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারে আনতে চায়। এ কারণে বিল-বন্ড কেনার প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি সুকুক বিনিয়োগেও নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

কী এই ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড

সরকার যখন বাজেট ঘাটতি পূরণ বা উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে, তখন বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি ঋণপত্র ইস্যু করে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্রকে বলা হয় ট্রেজারি বিল বা টি-বিল এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্রকে বলা হয় ট্রেজারি বন্ড বা বিজিটিবি।

ট্রেজারি বিল সাধারণত ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিনের মেয়াদে ইস্যু করা হয়। এগুলো ডিসকাউন্ট মূল্যে বিক্রি করা হয় এবং মেয়াদ শেষে পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ বিনিয়োগকারী কম দামে কিনে মেয়াদ শেষে বেশি মূল্য পান। এ দুইয়ের ব্যবধানই তার লাভ।

অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ডের মেয়াদ দুই বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব বন্ডে নির্দিষ্ট কুপন হারে সুদ দেওয়া হয় এবং সাধারণত প্রতি ছয় মাস অন্তর সুদ পরিশোধ করা হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত হওয়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ড দেশের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগপণ্যের মধ্যে অন্যতম। কারণ এখানে মূলধন হারানোর ঝুঁকি কার্যত নেই।

ব্যাংকের জন্য নয়, সাধারণ মানুষও কিনতে পারেন

অনেকের ধারণা, ট্রেজারি বিল ও বন্ড শুধু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। দেশের যেকোনও নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, ভবিষ্য তহবিল, এমনকি ছোট উদ্যোক্তারাও সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতেই নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ন্যূনতম ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেই সরকারি বিল বা বন্ড কেনা সম্ভব।

বিল-বন্ডে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি ‘বিজনেস পার্টনার আইডেন্টিফিকেশন’ বা বিপি আইডি হিসাব খুলতে হয়। সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এই হিসাব খোলা যায়।

এ জন্য প্রয়োজন হয়– জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি); টিআইএন সনদ; ছবি; ব্যাংক হিসাবের তথ্য; নমিনির তথ্য।

এরপর বিনিয়োগকারী চাইলে সরাসরি নিলামে অংশ নিতে পারেন অথবা সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে বিল-বন্ড কিনতে পারেন।

যেভাবে কাজ করে এই বাজার

সরকার যখন নতুন ট্রেজারি বিল বা বন্ড ছাড়ে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এই নিলামে অংশ নেয় প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংকগুলো।

পিডি ব্যাংকগুলো সরকারের কাছ থেকে বিল-বন্ড কিনে পরে বাজারে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে। একইসঙ্গে সেকেন্ডারি মার্কেটেও এসব সিকিউরিটিজ কেনাবেচা হয়।

বর্তমানে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক এই বাজারে সক্রিয়।

সম্প্রতি সরকার নতুন করে ব্র্যাক ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংককে প্রাইমারি ডিলার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ফলে দেশে পিডি ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬টিতে।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, পিডি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তারা এখন সরকারি বন্ডবাজারে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

সুদের হার কত

বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার ব্যাংক আমানত ও এফডিআরের তুলনায় বেশ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ২৯ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী– ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ; ১৮২ দিনের বিলের সুদহার ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ; ৩৬৪ দিনের বিলের সুদহার ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে সুদের হার আরও বেশি। যেমন-দুই থেকে তিন বছরের বন্ডে ১০ দশমিক ২ থেকে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ; পাঁচ বছরের বন্ডে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ; ১০ বছরের বন্ডে ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশ; ১৫ বছরের বন্ডে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং ২০ বছরের বন্ডে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে এই হার অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

মেয়াদপূর্তির আগেও বিক্রি করা যায়

ট্রেজারি বিল ও বন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও এগুলো বিক্রি করা যায়। অর্থাৎ বিনিয়োগকারী প্রয়োজন হলে সেকেন্ডারি মার্কেটে তা নগদায়ন করতে পারেন। তবে এ জন্য সংশ্লিষ্ট পিডি ব্যাংককে জানাতে হয় এবং বাজারদরের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে স্থির আয় নিশ্চিত করতে ট্রেজারি বন্ড কার্যকর হলেও স্বল্পমেয়াদি নগদ ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রেজারি বিল বেশি উপযোগী।

ইসলামি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাড়ছে সুকুকের সুযোগ

সরকারি সিকিউরিটিজের পাশাপাশি ইসলামি বিনিয়োগপণ্য ‘সুকুক’ নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগব্যবস্থা হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী এখন এটিকে বিকল্প নিরাপদ খাত হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সুকুকে বিনিয়োগ সহজ করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এখন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজেই ‘সুকুক ইনভেস্টর আইডি’ খোলা যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য আইডি খোলা, নিলামে অংশগ্রহণ ও বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ মাশুল সর্বোচ্চ ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য তা সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। এছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটে প্রতি লেনদেনে ১০০ টাকা মাশুল দিতে হবে। তবে মুনাফা, আসল ফেরত, হোল্ডিং রিপোর্ট কিংবা সুকুক আইডি বন্ধ করার ক্ষেত্রে কোনও মাশুল নেওয়া হবে না।

সুকুকে বিনিয়োগে কী লাগে

সুকুক ইনভেস্টর আইডি খুলতে প্রয়োজন হয়, আবেদন ফরম; ব্যাংক হিসাবের তথ্য; জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট; ছবি; টিআইএন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে); নমিনির তথ্য ও ছবি।

প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে নিবন্ধন সনদ, বোর্ড রেজোল্যুশন, মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, শরিয়াহ সিকিউরিটি মডিউলের মাধ্যমে এসব হিসাব পরিচালিত হবে।

কেন বাড়ছে আগ্রহ

বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশের কারণে মানুষ এখন নিরাপদ ও স্থিতিশীল আয়ের উৎস খুঁজছে।

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সীমা এবং কর কাঠামোর পরিবর্তনের পর অনেকে বিকল্প খুঁজছেন। আবার এফডিআরের সুদহার সবসময় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

এই বাস্তবতায় সরকারি ট্রেজারি বিল, বন্ড ও সুকুক এখন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি বাজারব্যবস্থা আরও সহজ করা যায়, অনলাইনে বিনিয়োগ সুবিধা বাড়ানো হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের বন্ডবাজার আরও বড় ও গভীর হতে পারে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়