মনজুর এ আজিজ : তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। একদিকে গরম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারন মানুষ। দেশে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এতে দৈনিক বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে ১ হাজার মেগাওয়াট।
জ্বালানি সংকটে দেশের ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক এ পরিমাণ লোডশেডিং করা হচ্ছে, যার বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলে দেওয়াই বিপাকে পড়েছেন সাধারন মানুষ। তবে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে পুরো সেচ মৌসুমে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এ সময় জ¦ালানি সংকটে বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতিতে মারাত্নক লোডশেডিংয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে পুরো দেশ।
জানা যায়, চলতি বছরে গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত জ্বালানি পণ্যের সাপ্লাই চেনে ব্যাঘাত ঘটে। ফার্নেস তেল, কয়লার মূল্য বেড়ে যাওয়া এবং এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সংকটে ভুগছে দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ফার্নেস তেলের দাম বাড়িয়েছে, তবুও সহসাই সংকট কাটছে না। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সাধারণত ব্যয়বহুল। জ্বালানি খাত নিয়ে সরকার আর্থিকভাবে চাপে থাকায় কয়লা ও গ্যাসের মাধ্যমে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চাচ্ছে।
তবে এক্ষেত্রেও চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো কেন্দ্রের উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। কয়লার আমদানিও কমে যাওয়ায় পূর্ণমাত্রায় তাপবিদ্যুকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে মারাত্নক চাপের মুখে পড়েছে বর্তমান সরকার।
সূত্র মতে, দেশে অবস্থিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩২ মেগাওয়াট, যেখানে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৫২ মেগাওয়াট। একই দিনে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) চাহিদা বেড়ে হয়েছিল ১৫ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সোমবার (২০ এপ্রিল) দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
বিপিডিবির গত ১৬ এপ্রিলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট উৎপাদনের বিপরীতে লোডশেডিং করা হয়েছে ১৪৮২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ঢাকায় সবচাইতে বেশি, ৩৬০ মেগাওয়াট লোডশেডিং। এছাড়া চট্টগ্রামে ১২০ মেগাওয়াট লোডশেডিং, খুলনায় ৩১৯ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১৯৫ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ২১০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ২৫ মেগাওয়াট, বরিশালে ৯৫ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং করা হয়েছে। সার্বিক হিসেবে ঢাকার বাইরে লোডশেডিং হয়েছে ১১২২ মেগাওয়াট।
ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্যানুসারে, ১৮ এপ্রিল দিনের শুরুতে সকাল ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট। তার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৫৯৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সে সময় লোডশেডিং করা হয়েছে ৮০৫ মেগাওয়াট। একইভাবে সকাল ৭টায় ১২৫৫ মেগাওয়াট, ৮টায় ৬৪৩ মেগাওয়াট, ৯টায় ৩৬০ মেগাওয়াট, ১০টায় ২০৯ মেগাওয়াট, বেলা ১১টায় ৬৭৯ মেগাওয়াট, দুপুর ১২টায় ১১০৬ মেগাওয়াট, ১টায় ১০৩৬ মেগাওয়াট, ২টায় ৮৪৪ মেগাওয়াট, বিকেল ৩টায় ৫৬২ মেগাওয়াট, ৪টায় ১৬৮ মেগাওয়াট, ৫টায় ১২৭ মেগাওয়াট, সন্ধ্যা ৬টায় ১১৮ মেগাওয়াট, ৭টায় ১২৮ মেগাওয়াট, রাত ৮টায় ১৪২ মেগাওয়াট, ৯টায় ৭৪ মেগাওয়াট, ১০টায় ১৪১ মেগাওয়াট, ১১টায় ৪৫১ মেগাওয়াট, ১২টায় ৭৩৩ মেগাওয়াট, রাত ১টায় ৮১৪ মেগাওয়াট, ২টায় ৮৯৮ মেগাওয়াট, ৩টায় ৯৫৩ মেগাওয়াট, ৪টায় ৯১৪ মেগাওয়াট ও ভোর ৫টায় ৬৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।
এদিকে আমাদের রংপুরের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ কখন যায় কখন আসে বোঝা যায় না। এখনো সেভাবে গরম শুরু হয়নি, অথচ তার আগেই যেভাবে দিনে ৭-৮ বার লোডশেডিং হচ্ছে, তা অনেকটা অসহনীয়। এতে কৃষি কাজের পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
জানা যায়, দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। তবে বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র ৮টি। এছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে ২টি।
গ্যাসভিত্তিক : ঘোড়াশাল রিপাওয়ারড ইউনিট ৪, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট ৫, ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল ১০৮ মেগাওয়াট, মেঘনাটঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৫৮৩ মেগাওয়াট, জেরা মেঘনাঘাট ৭১৮ মেগাওয়াট, বাঘাবাড়ী ৭১ মেগাওয়াট, সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট।
তেলভিত্তিক : গাগনগর ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট, জুলদাহ ১০০ মেগাওয়াট, জুলদাহ ২ ইউনিট ১০০ মেগাওয়াট, জঙ্গলিয়া ৫২ মেগাওয়াট, ফেনী লঙ্কা পাওয়ার, রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট, নাটোর ৫২ মেগাওয়াট।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল ঢাকা ও বরিশালে কোনো লোডশেডিং হয়নি। তবে চট্রগ্রামে ৯৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং, কুমিল্লায় ১১০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১০০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৩০ মেগাওয়াট, খুলনায় ১৪৫ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১১০ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৫৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।
জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা দুইভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চল গ্রিডের অধীনে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেট এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের অধীনে রয়েছে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর।
পিজিসিবির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের চাইতে পূর্বাঞ্চল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক বেশি। ১৮ এপ্রিল পূর্বাঞ্চল গ্রিডে ১০ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই সরবরাহ করা হয়েছে ৫৬১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৪২৫ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ১৩৭৮ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১০১৯ মেগাওয়াট ও সিলেটে ৫৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
নেসকোর (রংপুর অঞ্চল) ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী শাহাদৎ হোসেন সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে রংপুর বিভাগে চাহিদা ৯০০ মেগাওয়াট। আমরা চাহিদার তুলনায় ২৫-৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি। এ কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ ঢাকার বিদ্যুতের চাইতেও কম। ১৮ এপ্রিল ওয়েস্টার্ন গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে ৪২৯৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে খুলনায় ১৭৫৪ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৮৮ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১৪৯১ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৫৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
ঢাকার চেয়ে গ্রামের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। দিনের ৬ থেকে ৮ বারের লোডশেডিংয়ে গড়ে প্রতিদিন ৪-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি প্রভাব পড়েছে কৃষি কাজে, ছোট ছোট কলকারখানাগুলোতে।
রংপুর বিভাগে বর্তমানে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ঘাটতি ১৫-২০ মেগাওয়াট। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রংপুরে এখনো সেভাবে লোডশেডিং শুরু হয়নি। এদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধে সময় নির্ধারণ করলেও তা সরকারি তদারকের অভাবে প্রতিপালন করছেন না। রংপুরসহ আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোতে রাত ৯টার পরও দোকানপাট, বিপণি বিতান খোলা রাখা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা বলছেন, রংপুর অঞ্চলে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। চাহিদার তুলনায় খুব বেশি ঘাটতি না থাকায় এখনো তীব্র লোডশেডিং শুরু হয়নি।
অপরদিকে রাজশাহী অঞ্চলে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ। নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মখলেসুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা একেক সময় একেক রকম থাকে। তুলনামূলক সকালের দিকে চাহিদা কম থাকে। তাই এ সময় লোডশেডিং তেমন হয় না। তিনি বলেন, ২০ এপ্রিল রাজশাহী সার্কেল-১ এ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চাহিদা ও বরাদ্দ সমান ছিল (চাহিদা সর্বোচ্চ ১১৯.৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত ছিল)। ফলে কোনো লোডশেডিং হয়নি। তবে রাত ৮টায় চাহিদা বেড়ে ১২৪ মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ ছিল ১১১ মেগাওয়াট, ফলে এই সার্কেলে ১৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। রাজশাহী সার্কেল ২-এ সারা দিনে চাহিদা ৫৭ মেগাওয়াট থেকে ৬৮.৬ মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল।
নগরের বুধপাড়া এলাকার বাসিন্দা বলেন, সকালের দিকেও বিদ্যুৎ থাকে না অনেক সময়। আমাদের এলাকায় রাত ১০টার পরে বিদ্যুৎ গিয়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরে আসে। গভীর রাতেও কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। রাতে ঘুমাতে বেশ কষ্ট হয়।
এ প্রসঙ্গে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটা প্রভাব পড়ছে, তবে আমরা আশা করছি লোডশেডিং বড় আকারে হবে না। ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্দিষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।