শিরোনাম
◈ পাহাড়ি অঞ্চলে সফল আর্লি ওয়ার্নিং মডেল: আগাম সতর্কবার্তায় কমছে প্রাণহানি, ভূমিধস মোকাবিলায় নতুন আশার আলো ◈ মার্কিন ভিসা আবেদনকারীদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ‘পাবলিক’ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ◈ মিথ্যা কাহিনি ও জাল কাগজে অ্যাসাইলাম, হাজারো আবেদন বাতিলের হুঁশিয়ারি ◈ ট্রাম্পের অকথ্য ভাষায় গালাগাল প্রসঙ্গে নেতানিয়াহুে এবার যা বললেন ◈ মধ্যপ্রাচ্যের যে ১৪ দেশে নতুন সতর্কতা জারি করল যুক্তরাষ্ট্র ◈ বি‌শ্বের নেতৃত্ব নি‌য়ে যুক্তরাস্ট্র, রা‌শিয়া ও চী‌নের ম‌ধ্যে রশি টানাটানি ◈ বিশ্বকাপের প্রস্তু‌তি, ফ্রান্স‌কে হারা‌লো আইভ‌রি কোস্ট, স্পেনকে রুখে দিলো ইরাক ◈ ৩০০ ফিটে ঝটিকা মিছিলের অভিযোগে যুবলীগ নেতা আটক ◈ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে আবারো তলিয়ে গেছে যাত্রীবাহী বাস (ভিডিও) ◈ নতুন সতর্কতায় ‘সুপার এল নিনো’, কোন সংকটে পড়তে পারে বিশ্ব?

প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৪০ বিকাল
আপডেট : ০৩ জুন, ২০২৬, ০৪:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

স্বর্ণের দাম বাড়ছে, কিন্তু ইতিহাস কী সতর্ক সংকেত দিচ্ছে?

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বেড়েই চলেছে। গত ২০ বছরে স্বর্ণের দাম প্রায় ৮৪০ শতাংশ বেড়েছে যা প্রায় ৯ গুণের কাছাকাছি। আর গত এক দশকে দাম বেড়েছে প্রায় ৩৬০ শতাংশ, যা প্রায় সাড়ে ৪ গুণ। বাংলাদেশেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট; প্রায় প্রতিদিনই স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়ছে, ভাঙছে আগের রেকর্ড। প্রশ্ন উঠছে-এই ঊর্ধ্বগতি কি চলমানই থাকবে, নাকি ইতিহাসের মতো বড় কোনো দরপতনের ঝুঁকি সামনে অপেক্ষা করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে স্বর্ণের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়ে-১৯৮০ সালের ঐতিহাসিক উত্থান ও পতনের দিকে।ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১ সালের আগে বিশ্বে স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় স্থির। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় বিশ্ব অর্থনীতি চলেছে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার অধীনে, যেখানে স্বর্ণের দাম কার্যত প্রশাসনিকভাবে বেঁধে দেয়া ছিল-প্রতি আউন্স ৩৫ ডলার। ফলে তারও আগের কয়েক দশকে স্বর্ণের দাম বাড়া বা কমা বলতে তেমন কিছু ছিল না। বাজারের হাতে দাম ওঠানামার সুযোগই ছিল না। 

১৯৭১ সালে ডলারের সঙ্গে স্বর্ণের সরাসরি সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে স্বর্ণ প্রথমবারের মতো পুরোপুরি মুক্ত বাজারে প্রবেশ করে। এই অর্থে, ৭০-এর দশকের উত্থান ছিল স্বর্ণের মুক্ত বাজার যুগের প্রথম বড় বিস্ফোরণ। পরবর্তী ৯ বছরে, ১৯৭১ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৩৫ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৮৫০ ডলারে পৌঁছে যায়। হিসাব অনুযায়ী, এটি ছিল প্রায় ২,৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি বা প্রায় ২৪ গুণ দাম বৃদ্ধির সমান। আধুনিক আর্থিক ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এমন উল্লম্ফন আর কোনো বড় ধরনের সম্পদ বা মূল্যবান ধাতুর ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

এই উত্থানের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি তেল সংকট, ভিয়েতনাম যুদ্ধ–পরবর্তী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ইরান বিপ্লব এবং স্নায়ূযুদ্ধের উত্তেজনা-সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা কাগুজে মুদ্রার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন। অন্যদিকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা হু হু করে বাড়তে থাকে।

কিন্তু ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। ১৯৮০ সালে স্বর্ণের দাম যখন চূড়ায় পৌঁছায়, তখনই শুরু হয় সম্পূর্ণ বিপরীত যাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনে, ডলার তার শক্তি ফিরে পায়, আর তখনই স্বর্ণের প্রতি চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমতে শুরু করে। ফলাফল ছিল নির্মম-পরবর্তী দুই দশকের মধ্যে স্বর্ণের দাম প্রায় ৬৫–৭০ শতাংশ পড়ে যায়। প্রকৃত মূল্যের বিবেচনায় ১৯৮০ সালের শীর্ষে বিনিয়োগ করা অনেক বিনিয়োগকারীকে প্রায় ২৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে সেই দাম আবারও নিজের চোখে দেখতে।

এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকেই অর্থনীতিবিদরা বলেন, স্বর্ণের বাজারে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় তখনই, যখন সবাই ধরে নেয় দাম ‘আর কমবে না’।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৮০ সালের সঙ্গে একেবারে এক নয়। এখনকার বিশ্ব অর্থনীতি আরও বেশি জটিল ও বহুমুখী। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে উচ্চ ঋণ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক হারে স্বর্ণ কেনা-সব মিলিয়ে স্বর্ণের পক্ষে শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া, আজকের বাজারে ডেরিভেটিভ, ইটিএফ ডিজিটাল ট্রেডিংয়ের কারণে স্বর্ণে বিনিয়োগের কাঠামোও পাল্টে গেছে।

তবু একটি বিষয় অপরিবর্তিত-স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সম্পদ হলেও স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে এটি বড় ধরনের উঠানামার শিকার হতে পারে। ইতিহাস বলছে, ৫ গুণ বা ৯ গুণ বাড়া অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু ২৪ গুণ বৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। আর সেই ব্যতিক্রমের পরই এসেছিল দীর্ঘস্থায়ী পতন ও হতাশা।

বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ও ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটস-এর প্রতিষ্ঠাতা রে ডালিও মনে করেন,‘যখন মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা একসঙ্গে বাড়ে, তখন স্বর্ণ মানুষের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে। তবে ইতিহাস বলে, অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে দাম খুব দ্রুত বাড়লে একপর্যায়ে বড় ধরনের সংশোধন বা পতন অনিবার্য হয়ে উঠে।’

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ নুরিয়েল রুবিনি বলেন,‘স্বর্ণের দাম দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হলেও, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে এটি চরম অস্থির হয়ে উঠতে পারে। ১৯৮০ সালের অভিজ্ঞতা দেখায়-যখন স্বর্ণের দাম বাস্তব অর্থনৈতিক ভিত্তির চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়, তখন বাজার নিজেই নির্মমভাবে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় বাজারে দাম বাড়লেও তা বৈশ্বিক প্রবণতার প্রতিফলন বলা চলে। অতীত অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়-স্বর্ণে বিনিয়োগে আবেগ নয়, সময় ও ঝুঁকি বিবেচনাই সবচেয়ে জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, স্বর্ণের ইতিহাসে ১৯৮০ সালের উত্থান ছিল নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম। আর সেই ব্যতিক্রমের পর যা ঘটেছিল, তা আজও বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়