শিরোনাম
◈ পাহাড়ি অঞ্চলে সফল আর্লি ওয়ার্নিং মডেল: আগাম সতর্কবার্তায় কমছে প্রাণহানি, ভূমিধস মোকাবিলায় নতুন আশার আলো ◈ মার্কিন ভিসা আবেদনকারীদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ‘পাবলিক’ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ◈ মিথ্যা কাহিনি ও জাল কাগজে অ্যাসাইলাম, হাজারো আবেদন বাতিলের হুঁশিয়ারি ◈ ট্রাম্পের অকথ্য ভাষায় গালাগাল প্রসঙ্গে নেতানিয়াহুে এবার যা বললেন ◈ মধ্যপ্রাচ্যের যে ১৪ দেশে নতুন সতর্কতা জারি করল যুক্তরাষ্ট্র ◈ বি‌শ্বের নেতৃত্ব নি‌য়ে যুক্তরাস্ট্র, রা‌শিয়া ও চী‌নের ম‌ধ্যে রশি টানাটানি ◈ বিশ্বকাপের প্রস্তু‌তি, ফ্রান্স‌কে হারা‌লো আইভ‌রি কোস্ট, স্পেনকে রুখে দিলো ইরাক ◈ ৩০০ ফিটে ঝটিকা মিছিলের অভিযোগে যুবলীগ নেতা আটক ◈ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে আবারো তলিয়ে গেছে যাত্রীবাহী বাস (ভিডিও) ◈ নতুন সতর্কতায় ‘সুপার এল নিনো’, কোন সংকটে পড়তে পারে বিশ্ব?

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৮:১১ রাত
আপডেট : ১২ মে, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

লাইটার জাহাজ সংকটে বন্দরের বহির্নোঙরে আটকে পণ্যবাহী জাহাজ

রমজান সামনে রেখে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজের তীব্র সংকটের কারণে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে। এতে রোজার মাসে পণ্যের ঘাটতি ও দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে মোট ১০৮টি পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল। এসব জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন রমজানসংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য—গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল ও ভোজ্যতেল আছে। আরও পাঁচটি জাহাজে ২ লাখ টনের বেশি চিনি রয়েছে। সাতটি জাহাজে সার এবং ২৫টি জাহাজে সিমেন্টের ক্লিংকার বহন করা হচ্ছে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি মাদার ভেসেল লাইটার জাহাজের মাধ্যমে নদীবন্দর ও টার্মিনালে পণ্য পরিবহন করে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে খালাস শেষ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে লাইটারেজ সংকটের কারণে অপেক্ষার সময় বেড়ে ২০ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়িয়েছে। কিছু জাহাজ দিনের পর দিন কোনো পণ্যই খালাস করতে পারছে না।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। কুতুবদিয়ায় ৮ জানুয়ারি নোঙর করা 'কুইন ট্রেডার' জাহাজটি আকিজ ফ্লাওয়ার মিল, আর.বি ট্রেডার্স ও ক্রাউন ট্রেডার্সের জন্য ৫৪ হাজার টন গম নিয়ে আসে। তবে গত পাঁচ দিনে জাহাজটি মাত্র ৫ হাজার ৮৭০ টন গম খালাস করতে পেরেছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টন খালাস হওয়ার কথা। এই গতিতে পুরো পণ্য খালাসে প্রায় ৪০ দিন লেগে যেতে পারে বলে বন্দরের সূত্রগুলোর ধারণা।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (ডব্লিউটিসিসি) জানিয়েছে, লাইটার জাহাজের চাহিদা এর জোগানকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে। ১৩ জানুয়ারি ৯০টি মাদারশিপের জন্য ১০৪টি লাইটার জাহাজের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া গেছে মাত্র প্রায় ৫০টি।

খাদ্যপণ্যের চালানকে অগ্রাধিকার দিতে কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে নিজস্ব লাইটারেজ বহর রয়েছে—এমন বড় কোম্পানিগুলোর জন্য জাহাজ বরাদ্দ বন্ধ রেখেছে। তবুও সংকট কাটেনি। সরকারের আমদানি করা সারের ১০টি জাহাজ এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোনো লাইটারেজ সহায়তা না পেয়ে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে সরকারি গুদামে সার সরবরাহে ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং কৃষিখাতে তা নতুন করে চাপ বাড়াতে পারে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ

নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কর্তৃপক্ষ সংকটের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজ করছে—মিসিং লাইটার জাহাজগুলো খুঁজে বের করার জন্য। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

দৈনিক ডেমারেজে বিপুল ক্ষতি

ব্যবসায়ী ও শিপিং এজেন্টরা সতর্ক করছেন, রমজানকেন্দ্রিক চাহিদা বাড়ার ঠিক আগে এমন বিলম্ব বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সারওয়ার হোসেন সাগর বলেন, আনলোডিং অপারেশন (খালাস কার্যক্রম) প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, "যে জাহাজ ১০ দিনে বন্দর ছাড়ার কথা, সেটি এখন ২৫ থেকে ৩০ দিন অপেক্ষা করছে। প্রতিটি জাহাজের জন্য আমদানিকারকদের দৈনিক ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। প্রায় ৯০টি জাহাজের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক যোগ করলে ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ।"

শিল্পখাতের হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক মোট ডেমারেজ ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৬ থেকে ২০ লাখ ডলারের মধ্যে। আমদানিকারকদের ভাষ্য, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে এই অতিরিক্ত খরচের বোঝা শেষপর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই চাপানো হবে।

নাম না প্রকাশের শর্তে এক বড় খাদ্য আমদানিকারক বলেন, "এটা আর শুধু বন্দরের সমস্যা নয়। প্রতিদিন একটি জাহাজ যত বেশি সময় সাগরে অপেক্ষা করে, আমাদের খরচ তত বাড়ে। সেই খরচ শেষ পর্যন্ত পাইকারি ও খুচরা বাজারে প্রভাব ফেলে।"

নেপথ্যে একাধিক কারণ

ডব্লিউটিসিসি কর্মকর্তারা জানান, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঘন কুয়াশার কারণে নদীপথে নৌচলাচল ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৪১টি ঘাটে বর্তমানে ৬৩১টি লাইটার জাহাজ আটকে আছে, যার মধ্যে ৫১টি সরকারের আমদানি করা সার পরিবহনে নিয়োজিত।

সার বস্তাবন্দিতে বিলম্ব, ট্রাক ও শ্রমিকের সংকট এবং সরকারি গুদামে জটের কারণে এসব জাহাজ পণ্য খালাস করে দ্রুত ফিরেও আসতে পারছে না।

ডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক হাজি শফি বলেন, "নিবন্ধিত প্রায় ১ হাজার ২০টি লাইটারেজ জাহাজের মধ্যে যদি ৬৩০টির বেশি আটকে থাকে, তাহলে সংকট হওয়াই স্বাভাবিক। এর ওপর আবার ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ সারাদেশে পণ্য পৌঁছে দিতে বাইরে রয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, মোংলা ও পায়রা বন্দরের রুটে, পাশাপাশি ভারতগামী রুটে লাইটারেজ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের জন্য জাহাজের প্রাপ্যতা আরও কমে গেছে।

শিপ হ্যান্ডলারদের অভিযোগ: ব্যবস্থাপনায় গলদ

তবে শিপ হ্যান্ডলারদের অভিযোগ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও কঠোর নিয়ম পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। তাদের দাবি, রমজানের আগে কিছু লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং জাহাজ বরাদ্দের প্রক্রিয়া অতিরিক্ত অনমনীয়।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, "লাইটারেজ জাহাজকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে সব অংশীজনকে এক টেবিলে আনতে হবে। তা নাহলে রমজানে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।"

অপারেটররা বহির্নোঙরে ব্যক্তিমালিকানাধীন বা কারখানার নিজস্ব লাইটার জাহাজ ব্যবহারে বিধিনিষেধেরও সমালোচনা করেছেন।

সারওয়ার হোসেন বলেন, "অনেক আমদানিকারকের নিজস্ব জাহাজ অলস পড়ে আছে। জরুরি ভিত্তিতে নমনীয়তা দেখিয়ে বিকল্প জাহাজ ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, যাতে অন্তত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের খালাস সম্ভব হয়। এতেও জট অনেকটাই কমানো সম্ভব।"

পুরো অর্থনীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা

রমজান যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যবসায়ীরা সতর্ক করছেন—চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা সমগ্র অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে পাইকারি বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হবে এবং নিত্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, এই সংকট আর নিয়মিত জটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন জাতীয় সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজানের পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত, সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে জট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়