মহসিন কবির: জোট ও নির্বাচন নিয়ে কৌশলী বিএনপি। জোটের কে কে পাচ্ছেন বিএনপির সমর্থন সেটা এখনো খেলাসা হয়নি। তবে তারেক রহমান দেশে আসার পর নির্বাচন নিয়ে জোরেশোরে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।
প্রত্যেক আসনে দল মনোনীত প্রার্থীকে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ নির্দেশনা। প্রচারের জন্য নেওয়া হচ্ছে নানা কৌশল। আগামী ২৫ ডিসেম্বর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার আগেই নির্বাচনসংক্রান্ত কার্যক্রম গুছিয়ে নিচ্ছে বিএনপি।
গতকাল বুধবার দল মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠক শুরু হয়েছে। প্রথম দিনে সংসদীয় আসন পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে ১০৭ জন প্রার্থীর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন নেতারা। আজ বৃহস্পতিবারও বৈঠক চলবে এবং শুক্রবার বিরতি দিয়ে শেষ হবে আগামী শনিবার। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শুরু হওয়া বৈঠকে মহাসচিবসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সমাপনী বক্তব্য দেন তারেক রহমান।
সংসদ নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় ভিন্নতা আনার কথা আগেই জানিয়েছে বিএনপি। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটিও গঠন করেছে দলটি। নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গুলশানে একটি নতুন অফিস নেওয়া হয়েছে।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএনপির এমপি প্রার্থীদের করণীয় এবং প্রচার-প্রচারণা, মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ-পূরণ ও জমাদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনে জিততে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং জনসম্পৃক্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ ৮ দফা নিয়ে ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে পূর্ব ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেসব বিষয়ে আরও সহজভাবে মানুষের মাঝে তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্রে জানা গেছে, মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থীদের আগেই চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে প্রার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু তথ্য ও তালিকা নিয়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে– প্রতিটি নির্বাচনী আসনের জন্য মনোনীত একজন ইলেকশন এজেন্ট এবং পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম এমন দুজন ব্যক্তির নাম। পাশাপাশি সংসদীয় এলাকার জন্য প্রার্থীর মনোনীত একজন সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজারের তথ্যও জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চিঠিতে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির নাম, পদবি (যদি থাকে), বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, সচল হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং দুই কপি ছবি সঙ্গে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে কার্যত বিএনপির নেতৃত্ব ভোটের দিন কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, এজেন্টদের প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল প্রচারণাকে আরও সুসংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য প্রার্থীদের সঙ্গেও বৈঠক করবে বিএনপি। বৈঠকের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণবিষয়ক সহসম্পাদক নেওয়াজ হালিমা আর্লি ও নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারীর পরিচালনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার, দলের মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা রেহান আসাদ।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক প্রার্থী জানান, এটি মূলত একটি কর্মশালা। নির্বাচনসংক্রান্ত সার্বিক বিষয়ে প্রার্থীদের নির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিরা। নির্বাচনী এলাকার কেন্দ্র এবং আসনভিত্তিক ভোটারলিস্ট প্রার্থীরা কীভাবে ভোটারদের কাছে পাঠাবেন বা প্রচারণা চালাবেন, সেসব বিষয় তুলে ধরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বক্তব্য দেন।
জানা গেছে, ব্যাংকের ঋণ ও অন্যান্য আইনগত ঝামেলা আছে এমন প্রার্থীদের বিকল্প প্রার্থীও ঠিক করে রেখেছে বিএনপি। তবে খুবই সীমিত আসনে এ পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। অর্থাৎ মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ, পূরণ ও জমা দেওয়া থেকে শুরু করে জামানত ফি-সহ সব কার্যক্রম সম্পন্ন করছে দল।
এ বিষয় গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সভাপতি ও গাইবান্ধা-৩ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী অধ্যাপক ডা. মাইনুল হোসেন সাদিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু হলো নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের করণীয় নিয়ে আলোচনা। ৮ দফাকে সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের কাছে আরও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চান ধানের শীষের সবাই এমপি হিসেবে নির্বাচিত হবেন।
পঞ্চগড়-২ আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বৈঠকটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভোটারসহ সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচারণা চালানো, বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ ৮ দফা নিয়ে প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী, ক্রীড়া, যুবকদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও পরিবেশ বিষয়ে বিএনপির পরিকল্পনা তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
গাইবান্ধা-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার বলেছেন, ১০৭ জন এমপি প্রার্থীকে ডেকে গুলশান কার্যালয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। এছাড়া নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলাসহ দলের কৌশল অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি দৃশ্যত জোটের পথে হাঁটছে না, কিন্তু পর্দার আড়ালে চলছে সূক্ষ্ম সমঝোতার হিসাব। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে এত দিনের ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনের ভাবনায় পরিবর্তন এনে দলটি এখন আনুষ্ঠানিক জোট নয়, আসনভিত্তিক সমঝোতার কৌশল বেছে নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচনে শরিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো জোট হচ্ছে না বিএনপির। তবে কয়েকটি নির্দিষ্ট আসনে সমঝোতার মাধ্যমে ছাড় দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শরিক দলগুলোর কয়েকজন শীর্ষ নেতার আসনে বিএনপি প্রার্থী দেবে না। আবার যেসব আসনে আগে থেকেই প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে সমঝোতা হলে সেই প্রার্থী সরিয়ে নেওয়ার পথও খোলা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কিছু আসনে প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার চিন্তাও করছে বিএনপি। এসব আসনে শরিক দলগুলো চাইলে বিএনপির প্রার্থীর বিপক্ষে নির্বাচন করতে পারবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক বাস্তবতা ও মাঠের সমীকরণ বিবেচনায় রেখেই এমন নমনীয় কৌশল নিচ্ছে দলটি বলে জানা গেছে।
দলীয় নেতাদের মতে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচন সহজ হবে-এমন ধারণা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। গত তিনটি নির্বাচনে ভোটের সুযোগ না থাকায় বিএনপির ভেতরে তৈরি হয়েছে প্রার্থীজট। পাশাপাশি দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর এবার বহু নেতা নির্বাচন করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ফলে শরিকদের আসন ছাড় দেওয়ার প্রশ্নে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
শরিকদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে থাকা নেতারা জানান, বিজয়ের সম্ভাবনা আছে-এমন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে আসন ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে কোন আসনে কাকে ছাড় দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে।
ইতিমধ্যে বিএনপি দুই দফায় ২৭২টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এসব ঘোষণার আগে শরিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। শরিক দলগুলোর দাবি, ঘোষিত আসনগুলোর মধ্যেই এমন কিছু আসন রয়েছে, যেখানে তারা প্রার্থী দিতে চায়।
গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতার আসনে বিএনপি প্রার্থী না দেওয়ার চিন্তা করছে। নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, জেএসডি ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাদের আসন নিয়ে সমঝোতার আলোচনা চলছে। পাশাপাশি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গেও আলাদা গুরুত্ব দিয়ে কথা বলছে বিএনপি।
আসন সমঝোতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি লন্ডনে থেকে সিদ্ধান্ত দেবেন নাকি দেশে ফিরে তা চূড়ান্ত করবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। ২৫ ডিসেম্বর তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। এর মধ্যেই মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা শেষ হবে।
সব মিলিয়ে প্রকাশ্যে জোট নয়, নীরব সমঝোতার পথেই এগোচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনী মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এই কৌশল কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।