শাজাজাদা এমরান: আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং দেশবাসীর দোয়ায় বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে গোটা দেশের মানুষ তার জন্য দোয়া করছেন। এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন এশিয়া মহাদেশে সত্যিই বিরল। এমন আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, যা খালেদা জিয়া অর্জন করেছেন।
একজন গৃহবধূ থেকে বেগম খালেদা জিয়া কিভাবে বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হলেন, সেই বিষয়েই আজ আলোকপাত করা যাক।
১৯৮৩ সালে আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি, তখন নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা পড়তাম। সে সময় এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একত্রে আন্দোলন করেছেন। পত্রিকাগুলোর শিরোনামে তখন এক পাশে খালেদা জিয়া ও আরেক পাশে শেখ হাসিনাকে রাখা হতো। সে সময়ের ইত্তেফাক পত্রিকার একটি শিরোনাম আজও আমার মনে পড়ে। শিরোনামটি ছিল এমন: "এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব না - খালেদা জিয়া"। তিনি বলেছিলেন, এ সরকার বন্দুকের গুলি দিয়ে বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্র দখল করেছে। এই স্বৈরাচার সরকারের আমলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।
আমরা জানি, আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে যখন একদল বিপথগামী সেনা সদস্য চট্টগ্রামে হত্যা করে, তখন আজকের তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো ছোট ছিলেন। তখন দলের সকলের অনুরোধে গৃহবধূ খালেদা জিয়া রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ স্বৈরাচারী এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তীব্র আন্দোলনের মুখে এরশাদের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়া তার সাথে একদিনের জন্যও আপোষ করেননি। এজন্য তাকে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, কিন্তু তিনি নীতিতে ছিলেন অটল ও আপোষহীন।
১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গঠিত হয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী এককভাবে এবং বাম ঘরানার সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ৫ দলীয় জোট। ৫ দলীয় জোটের আপত্তির কারণে তৎকালীন সময়ে জামায়াতের সাথে ৮, ৭ ও ৫ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন না করলেও তারা যুগপৎ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের অধীনে এই তিন জোট ও জামায়াত কোনো জাতীয় নির্বাচনে যাবে না। ইতিমধ্যে সরকার তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দেয়।
তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ২ দিন আগে চট্টগ্রামের লালদিঘীর এক সমাবেশে শেখ হাসিনা প্রধান অতিথির ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, 'এরশাদের অধীনে যারা নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে।' ঠিক সেই দিন রাতে ঢাকায় ফিরেই পরদিন শেখ হাসিনা নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন এবং সাথে জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনে যায়।
তখন এরশাদ সরকার সামরিক-বেসামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা করলেও তিনি রাজি হননি। তখনকার সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নির্মল সেন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, "আমি আজ থেকে খালেদা জিয়াকে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে ঘোষণা করলাম। তাঁর নেতৃত্বে আমরা এরশাদ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলব।" সেই থেকেই খালেদা জিয়াকে সবাই আপোষহীন নেত্রী হিসেবে বলতে শুরু করে।
পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোটকে বাইরে রেখে গঠিত হওয়া ১৯৮৬ সালের এই সংসদ দুই বছরও টেকেনি। ১৯৮৮ সালে নানা কারণে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। একই বছর এরশাদ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচনে অবশ্য স্বীকৃত কোনো রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। সেবার এরশাদের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গড়ে উঠা জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হয়েছিলেন জাসদের আ.স.ম আবদুর রব, যাকে খালেদা জিয়া 'গৃহপালিত বিরোধী দল' হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। যেমন গত সতেরো বছর আওয়ামী লীগের গৃহপালিত বিরোধী দল ছিল সেই এরশাদের জাতীয় পার্টি।
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পেছনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল খালেদা জিয়ার। তাঁর আপোষহীন মনোভাব সকল দলকে একসাথে করে এরশাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহস যুগিয়েছিল। এরপর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জয়লাভ করে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল একমাত্র খালেদা জিয়ার আপোষহীনতার কারণে।
এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফাভাবে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে বিএনপি। সেই নির্বাচনের মেয়াদ মাত্র ১৫ দিন হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে ব্যাপক। এই ষষ্ঠ জাতীয় সংসদেই নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস হয়, যা তৎকালীন দেশের সকল রাজনৈতিক দলের একমাত্র দাবি ছিল।
পরে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেও খালেদা জিয়ার বিএনপি ১১৬টি আসন নিয়ে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বিরোধী দল হিসেবে পার্লামেন্টে যায়। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার গঠন করে। আবার প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া।
১/১১ সরকার খালেদা জিয়ার পুরো পরিবারকে দেশ থেকে বের করতে চেয়েছিল। সকল প্রকার চাপ ও অত্যাচার সত্ত্বেও খালেদা জিয়া রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, "বাংলাদেশ ছাড়া আমার কোনো জায়গা নেই। যদি আমার মরতে হয় আমি মরব, তবুও এই দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না।" তিনি আরও বলেছিলেন, "বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই।" সেদিন যদি বেগম খালেদা জিয়া ১/১১ সরকারের সাথে আপোষ করতেন, তাহলে হয়তো তার বড় ছেলে তারেক রহমানকেও নির্মম নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারতেন এবং তাকেও প্রায় দুই বছর জেলের ভাত খেতে হতো না।
২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। সেই থেকে বাংলাদেশের মাথার ওপর বসে পড়ল এক ফ্যাসিবাদী সরকার, যা প্রায় সতেরো বছর জাতির কাঁধে জগদ্দল পাথরের মতো বসেছিল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ গত সতেরো বছর জিয়া পরিবার তথা বিএনপির বিরুদ্ধে এমন কোনো নির্যাতন নেই যা করেনি। এমন কোনো হীন ও ঘৃণ্য কথা নেই যা শেখ হাসিনা নিজে ও তার দলের নেতারা বেগম খালেদা জিয়াকে বলেননি। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে যত ছোট করা যায়, বাংলা অভিধানে যতগুলো শব্দ ছিল, তার সবই প্রয়োগ করেছিল শেখ হাসিনা।
এমনকি, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি টাকা অন্য একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার অপরাধে 'এতিমের টাকা চুরি করে খেয়ে ফেলেছে' বলে খোদ শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে একাধিকবার মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই মিথ্যা মামলায় তাকে সাজা দিয়ে ১৮ মাস পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখে। সুচিকিৎসার অভাবে বারবার বেগম খালেদা জিয়া এই ১৮ মাস মৃত্যুর পথযাত্রী ছিলেন। তাকে বিদেশে চিকিৎসা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তারপরেও তিনি আপোষ করেননি। বেগম খালেদা জিয়া যেদিন জেলখানায় যান, সেদিন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন এবং আদালতে বক্তব্য রেখেছিলেন। কিন্তু গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্ত হওয়া খালেদা জিয়া কিন্তু সুস্থ হয়ে বের হননি। প্রতিনিয়ত মৃত্যু তাকে তাড়া করে ফিরছে। বিএনপি বারবার অভিযোগ করছে, কারাগারে বেগম খালেদা জিয়াকে খাবারের সাথে স্লো পয়জনিং মিশিয়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ, যাতে তিনি আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান।
আজ সেই বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সারাদেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া সকল মানুষের প্রয়োজন হয়ে উঠলেন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের সরকার প্রধান থেকে শুরু করে এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই যারা খালেদা জিয়ার জন্য নিজেরা শুধু দোয়াই করছেন না, দেশবাসীর কাছেও দোয়া চাইছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক নেতার ফেসবুক পোস্টও দেখেছি খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করতে। জীবনে একজন রাজনৈতিক নেতার এর চেয়ে বেশি চাওয়া-পাওয়ার আর কী থাকতে পারে?
বেগম খালেদা জিয়া একজন সামান্য গৃহবধূ থেকে আজ হয়ে উঠেছেন স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশের ঐক্যের প্রতীক। একজন সফল অভিভাবক। আজ তিনি বাংলাদেশের সকল দল, মত, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে সবার ঊর্ধ্বে। বেগম খালেদা জিয়া এখন আর বিএনপির সম্পদ নন, তিনি গোটা দেশের অহংকারের সম্পদে পরিণত হয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বে এমন ভাগ্য কতজন রাজনৈতিক নেতার কপালে জোটে, যা জুটেছে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ৩ বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের মানুষ যাকে বলে 'আপোষহীন দেশনেত্রী' বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে।
মহান প্রভুর কাছে দোয়া করি, গত সতেরো বছর ধরে যেই গণতন্ত্রকে হারিয়েছে প্রিয় স্বদেশ, সেই হারানো গণতন্ত্র ফিরে পাবার এই সময়টায় যেন বেগম খালেদা জিয়া নেক হায়াত পান, এই প্রার্থনা করছি।
লেখক পরিচিতি:
সম্পাদক, দৈনিক কুমিল্লার জমিন, ব্যুরো চীফ, দৈনিক দিনকাল ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লা জেলা শাখা। ০১৭১১-৩৮৮৩০৮