শিরোনাম
◈ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত হবে, লবণচাষীরা পাবেন ন্যায্যমূল্য ◈ বাংলাদেশকে স্বনির্ভর ও শিল্পোন্নত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: মির্জা ফখরুল ◈ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল: অর্থনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক? ◈ ক্রিকেটার নাঈমের শারী‌রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে চট্টগ্রামে গে‌লেন বিসিবির ফিজিওরা ◈ ব্রাজিলের এক‌টি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মরক্কোর বিপক্ষে জয় চান না ◈ ইংল্যান্ড দ‌লের বল ও বুটসহ অ‌নেক অনুশীলন সরঞ্জাম চুরি ◈ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে একটি করে গাছ লাগান: প্রধানমন্ত্রী ◈ বিপ্লবের পর বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা ◈ জুলাইয়ে সমাহিত হবেন খামেনি, ঘোষণা ইরানের ◈ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধে ইরানের সঙ্গে গোপন সমঝোতা আমিরাতের? ১০-২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের তথ্য প্রকাশ করল রয়টার্স

প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৬, ০৮:৪০ রাত
আপডেট : ১৩ জুন, ২০২৬, ১১:১৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মমতার বক্তব্যে ভারত ভূ-রাজনৈতিক সংকটে 

দি প্রিন্ট বিশ্লেষণ : বাংলাদেশি ছাত্রনেতা ওসমান হাদির হত্যাকারী এবং তার কথিত ভারত সংযোগ নিয়ে তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের দেওয়া মিডিয়ায় বক্তব্য শুধুমাত্র ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে বিব্রত করা নয়, বরং ভারতকে একটি ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় ফেলা। মমতার অভিযোগ, গত ডিসেম্বরে ঢাকায় বাংলাদেশি যুব নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ না করার জন্য অমিত শাহ তাঁকে বলেছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গে টিএমসি-র ভাঙন এবং ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনই এখন বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে সমর্থন করায়, এটা স্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা এবং বিজেপির মধ্যে আর কোনো সদ্ভাব নেই।

এমন সময়ে, মমতার মতো একজন পোড়খাওয়া লড়াকু নেতা বিজেপির প্রতি কোনো রাজনৈতিক সৌজন্য দেখাবেন, এমনটা আশা করা অবাস্তব। বরং, তাঁর দলের অস্তিত্বের এমন সংকটের সময়ে, বিজেপিকে বিব্রতকর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে এমন সবকিছু করাই হয়তো তাঁর জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় যা মেশানো উচিত নয়, তা শুধু মমতার ক্ষেত্রেই নয়, ভারতের যেকোনো রাজনৈতিক দলের কোনো রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, আর তা হলো দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে আপস করা।

মমতার এই পদক্ষেপটি হয়তো তাঁর দলের কফিনে শেষ পেরেক হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর টিএমসি ইতিমধ্যেই তার সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।

মমতা কী জানেন?

সম্প্রতি কলকাতায় একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে মমতা অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁকে গত ডিসেম্বরে ঢাকায় জনপ্রিয় বাংলাদেশী যুবনেতা ওসমান হাদির দিনের আলোয় হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ না করতে বলেছিলেন।

হাদির রাজনৈতিক মঞ্চ ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ একটি ফেসবুক পোস্টে হাদির মৃত্যুকে “ভারতীয় আধিপত্যের” বিরুদ্ধে সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছে। পোস্টটিতে লেখা হয়েছে, “ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আল্লাহ মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।”

ভারত তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারত কখনও তার ভূখণ্ডকে “বাংলাদেশের বন্ধু জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী” কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা আশা করি, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনসহ অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

গত ৮ মার্চ, হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তবর্তী বনগাঁ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স আটক করে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায় “তারা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ভারতের বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বনগাঁয়ে আসে।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য, যারা দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে, হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার একটি ইতিবাচক খবর। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এই গ্রেপ্তার নিশ্চিত করে যে, ভারতকে এমন প্রতিবেশী হিসেবে দেখা হবে না, যারা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কার্যকলাপের জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফরের পরপরই এই গ্রেপ্তারগুলো করা হয়েছে।”

কিন্তু মমতা আলোচনায় আসার আগের ঘটনা এটি। তিনি দাবি করেছেন যে বাংলাদেশে একটি ‘বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড’ সম্পর্কে তাঁর সম্পূর্ণ ধারণা আছে এবং অভিযোগ করেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের পর শাহ ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে ফোন করে খবরটি চেপে যেতে বলেছিলেন। সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে তাঁর দলীয় কর্মীদের সঙ্গে এক অবস্থান কর্মসূচিতে মমতা বলেন, “আমি এতদিন এ বিষয়ে কথা বলিনি। আমি এখন কথা বলছি কারণ নিপীড়ন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এখনও আমি সৌজন্যের খাতিরে সেই ব্যক্তির নাম বলছি না। বাংলাদেশের মানুষ ক্ষিপ্ত হবে। আমি তা চাই না। আমি দেশকে ভালোবাসি।”

ওই সমাবেশেই নাম প্রকাশ করতে বলা হলে মমতা বলেন, “না, আমি দেশের স্বার্থে তা বলব না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, ‘দয়া করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে বলুন যেন এই বিষয়টি প্রকাশ্যে না আসে। এটা দেশের স্বার্থে।’

তিনি আরও বলেন, “হত্যাকাণ্ডটি চালানোর জন্য কাকে ব্যবহার করা হয়েছিল? কাদের নাম সামনে এসেছিল? আজ সরকার বদলালেও আমি এখনও সবকিছু জানি। আমার হৃদয় হলো শব্দ, তথ্য এবং সত্যের ভান্ডার।”

গত ৩ জুন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবেদ ইসলাম বলেন যে, মমতার মন্তব্যের জবাব দেবে না ঢাকা। অন্য একটি দেশে নির্বাচন হয়েছে এবং একজন রাজনৈতিক নেতা কিছু মন্তব্য করেছেন। এটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।”

দ্য টেলিগ্রাফ লিখেছে যে, এর তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক প্রভাব সীমিত হতে পারে, বিশেষ করে বিষয়টিকে লঘু করে দেখানোর জন্য ঢাকার প্রচেষ্টার কারণে। কিন্তু এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে দক্ষিণ এশিয়ায় অমীমাংসিত রাজনৈতিক বিতর্কগুলো কত দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে।”

ঢাকা ও দিল্লি যখন সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে, তখনও এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোর প্রতি গুরুত্ব সহকারে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তি, যার মেয়াদ এই ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে, অবৈধ দখল উচ্ছেদে নতুন বিজেপি সরকারের ‘বুলডোজার অভিযান’ মূলত মুসলিম-বিরোধী। একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংবাদপত্র প্রথম আলো ইংলিশ বলেছে: “দক্ষিণ কলকাতার একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দুজনের মৃত্যুর পর, ওই এলাকার কথিত অবৈধ স্থাপনাগুলো বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এলাকাটি মূলত মুসলিম অধ্যুষিত। এই ঘটনার প্রতিবাদে বাসিন্দারা বিক্ষোভ করেছেন।”

একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঈদুল আজহার আগে পশ্চিমবঙ্গে গবাদি পশু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এমন একটি সংকটময় সময়ে মমতার মন্তব্য ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত জয়দীপ মজুমদার মমতার হাদি হত্যাকান্ড নিয়ে বক্তব্যকে স্বাভাবিক হিসেবে নেননি। তিনি বলেন, “মমতার নিজের রাজনৈতিক স্বার্থই প্রথমে আসে, তারপরে পরিবারের, তারপর দলের এবং সবশেষে, সর্বদাই দেশের। হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁর অভিযোগটি কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই ছিল না, বরং চরমভাবে দেশবিরোধী ছিল এবং এটি এমন একজনের মরিয়া ভাবকে প্রতিফলিত করে, যিনি রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য নিজের দেশের স্বার্থ বিপন্ন করতেও দ্বিধা করেন না।” মজুমদার দ্যপ্রিন্টকে একথা বলেন।

নিশ্চয়ই, এই তেজস্বী রাজনৈতিক নেত্রী, যিনি ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছেন এবং একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি ভারতের স্বার্থে আঘাত হানতে চাইবেন না। (সংক্ষেপিত)

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়