শিরোনাম
◈ ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে ‘জিরো সিগন্যাল’ মহাপরিকল্পনা, ব্যয় আড়াই হাজার কোটি টাকা ◈ সংসদে প্রতিশ্রুতি দিলে স্ট্যাডি করেই দেবেন: জ্বালানিমন্ত্রীকে স্পিকার (ভিডিও) ◈ ব্রাজিলের জার্সির রঙ সাদা থেকে যেভাবে হলুদ হয়ে উঠলো  ◈ ৬ শিশুর প্রত্যেকের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে দেবে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ◈ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু, প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে ◈ পাঁচ সদস্যের সভাপতি মন্ডলীর নাম ঘোষণা ◈ বিশ্বকাপ প্রস্তু‌তি ম‌্যাচ, মে‌সি‌কে ছাড়াই হন্ডুরাসকে ২-০ গো‌লে হারালো আর্জেন্টিনা  ◈ একটি শিশুর ওপর নির্যাতন পুরো সমাজকে আহত করে: রামিসার রায়ে আদালতের বার্তা ◈ এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত হতে হবে: তারেক রহমান ◈ বালুবোঝাই ট্রাক উঠতেই ভেঙে পড়ল সেতু, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:১৫ রাত
আপডেট : ০৬ জুন, ২০২৬, ০৫:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পাসপোর্টের 'দালাল' নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তে সমালোচনা কেন

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। পাসপোর্ট অফিসে অর্থের বিনিময়ে সহায়তাকারী এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারী, যারা 'দালাল' নামেও অনেকের কাছে পরিচিত, তাদের নিবন্ধনের মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাইছে সরকার।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একই ধরনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। এখন সেই আদলেই এই মধ্যস্থতাকারীদের নতুন করে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ভোগান্তি লাঘব এবং নিয়মের মধ্যে আনতে দলিল লেখকদের আদলে পাসপোর্টের সহায়তাকারীদের পরীক্ষামূলকভাবে নিবন্ধনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পাসপোর্টের কাজে সহায়তাকারীদের বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলছেন, এর মাধ্যমে পাসপোর্টের 'দালাল চক্রের' বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন মধ্যস্থতাকারীদের বৈধতা না দিয়ে পাসপোর্ট করতে হয়রানি ও ভোগান্তি বন্ধ করতে পদ্ধতি সহজ করা প্রয়োজন।

এছাড়া পাসপোর্টের দালালদের বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়া হতে পারে বলেও সমালোচনা রয়েছে।

এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০২১ সালে পাসপোর্ট অফিসের মধ্যস্থতাকারী বা দালালদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর।

এজেন্টদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয় এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তর মিলে বিধিমালা তৈরির কাজ শুরুর কথাও তখন জানিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগ।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেই বিধিমালা করা হয়েছিল কি না, বা তার অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সরকার যা বলছে
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন আবার পাসপোর্ট অফিসে অর্থের বিনিময়ে সহায়তাকারী বা মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তিদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে।

সোমবার মন্ত্রণালয়ে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাদের মাধ্যমে এমনকি পাসপোর্ট অফিসের কিছু লোকজন- তাদের যোগসাজসে জনগণের মধ্যে একটু ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। সেটা নিরসন করার জন্য এই পদক্ষেপ।

"আমরা যেমন দেখি যে রেজিস্ট্রি অফিসের বাইরে যেমন দলিল লেখক থাকে তাদের রেজিস্ট্রেশন থাকে, নম্বর থাকে। কোথাও কোনো অনিয়ম হলে তাকে দায়বদ্ধ করা যায়। সেরকম কোনো সিস্টেমের মাধ্যমে এখানে একটা সহজীকরণ এনলিস্টেড সহায়তাকারী ব্যবস্থা করা যায় কি না। তাহলে কিছু কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়, জনগণেরও জন্য সহজ হয়"।

মন্ত্রী জানান, নিবন্ধিত সহায়তাকারীরা নির্দিষ্ট কাজের জন্য সার্ভিস চার্জ কত নিতে পারে সেটা ঠিক করে দেওয়া হবে। তার ভাষায়, এখন বিচ্ছিন্নভাবে করছে, এটাকে পদ্ধতির মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা থেকেই এ উদ্যোগ।

"ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মাধ্যমে যদি টিকে যায় তাহলে সারাদেশের জন্য হতে পারে। এখন রেজিস্ট্রেশন অফিসের আদলে যেভাবে রেজিস্ট্রার্ড দলিল লেখক থাকে সেই আদলে যদি আমরা এখানে কিছু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারি, রেগুলেট করা যায়, জনগণও যদি সেবা পায়, কোনো অনিয়ম করলে যাতে তাদের ধরা যায়," বলেন মন্ত্রী।

বাস্তবতা কী
বাংলাদেশে এখন ই-পাসপোর্ট সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা হচ্ছে।

অনলাইনে ফরম পূরণ করে আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখ পেয়ে থাকেন। ব্যাংকে নির্ধারিত টাকা জমা দিয়ে ওই তারিখে এসে তিনি ছবি তোলাসহ প্রয়োজনীয় কাজ করার নিয়ম। এখানে দালালের সাথে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ মানুষ পাসপোর্ট করতে নানারকম বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে।

অনলাইন সার্ভারে প্রবেশ, আবেদন করা, শিডিউল নেওয়া থেকে সশরীরে গিয়ে ছবি তোলা ও বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনের পড়াসহ নানা ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে তদবির কিংবা দালালদের টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয় এমন অভিজ্ঞতাও আছে কারো কারো।

ফলে বাংলাদেশে পাসপোর্ট তৈরি করতে এখনো সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টদের সহযোগিতা নেয়।

এমন অভিযোগ বা অভিজ্ঞতাও অনেকের রয়েছে যে অনেক সময় দ্রুত কাজ করতে দালালের শরণাপন্ন হন কেউ কেউ, আবার অনেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে পাসপোর্ট আবেদন থেকে শুরু করে নবায়ন শেষ করা পর্যন্ত সহযোগিতা নিয়ে থাকেন।

বর্তমানে পাসপোর্টের আবেদনের সময় অনলাইনে নির্দিষ্ট দিন এবং নির্ধারিত টাইম স্লট বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু টাইম স্লট অনুযায়ী পাসপোর্ট অফিসে কখনোই সেবা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

যদিও উন্নত দেশে পাসপোর্টের মতো সেবা সম্পূর্ণ অনলাইনে হয় এবং এমনকি পাসপোর্ট বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও আছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক নাদিরা আক্তার এই বাস্তবতা স্বীকার করে বলেন, আবেদনকারীরা সবাই সময়মতো আসেন না বলেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

"এখন আমাদের অনেকগুলো অফিস শিডিউল জটিলতা নাই। বাংলাদেশের আসপেক্টে টাইম মেইনটেইন করাটা ডিফিকাল্ট হয়। আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে সেবা দেওয়া হয়। আপনার টাইম নয়টায়, আপনি আসলেন ১২টায়। কিন্তু আপনাকে আমি ছেড়ে দিতে পারবো না। এটা খুব প্র্যাকটিক্যালি মেইনটেইন হচ্ছে সেটা দেখি না। আবার ওই সময় অতিক্রম করলে তারটা নিচ্ছি না এমন কিন্তু না।"

মিশ্র প্রতিক্রিয়া
এই উদ্যোগকে পাসপোর্ট অফিসের সামনে সহায়তাকারী এজেন্টরা 'ভালো উদ্যোগ' হিসেবে দেখছেন।

ঢাকার একটি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কাছে দোকান খুলে পাসপোর্টসহ অনলাইন আবেদন ও ফি পরিশোধে সহায়তা করেন আপন আহমেদ। তিনি বলেন, নিবন্ধনের মধ্যে আসলে ভালো হয়। অনেকেই নানারকম সমস্যায় পড়ে।

"অনলাইনে তো সবকিছুই করা যায়। কিন্তু সবাই তো এটা নিজেরা টাইপ করতে পারে না কম্পিউটারে বা মোবাইলে। আমাদের কাছে আসলে তথ্যগুলো ঠিকমতো করতে পারে। এজন্যই আমাদের কাছে আসে"।

দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবির গবেষণায় সবসময়ই সেবাখাতে দুর্নীতির তালিকার শীর্ষে থাকে পাসপোর্ট সেবা খাত। পাসপোর্ট করতে সাধারণ মানুষকে ঘুষ দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয় এমন অভিযোগ বরাবরই উঠে আসে।

পাসপোর্টের দালালদের আইনি বৈধতা দেওয়ার বিপক্ষে টিআইবি।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই সেবা ডিজিটালাইজড করে সহজ এবং সাধারণ মানুষের জন্য সেবামুখী করার পরিবর্তে "দালাল চক্রকে বৈধতা দেওয়া ঠিক হবে না"।

"সহায়ক হিসেবে যারা আসলে দালাল তাদের যদি বৈধতা দেওয়া হয় তাহলে এটা সাময়িক সুবিধাটা সরকার ভাবছেন। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটাকে বুঝতে হবে, বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ এর ফলে যেটা হবে যে এই অবৈধতাটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া আইনগত ভিত্তি তৈরি করা হবে"।

তিনি মনে করেন, যদি এই ধরনের সুযোগ তৈরি করা হয় এটা আরো বেশি বুমেরাং হওয়ার ঝুঁকি আছে।

"পুরো প্রক্রিয়াটাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজতর করার জন্য পদ্ধতি বিবেচনা করতে হবে যেটা অসম্ভব না। আমি বলবো পাসপোর্ট সেবার পুরো খাতটাকে এন্ড টু এন্ড ডিজিটাইজেশন যদি সম্পন্ন করা হয় এবং একসেসটাকে যদি সহজতর করা হয় তাহলে আমরা মনে করি না যে এটার প্রয়োজন আছে"।

ইফতেখারুজ্জামানর মতে, এর মাধ্যমে দুর্নীতির বাস্তবতাটাকে মেনে নেওয়া হবে। বরং দলিল লেখকদেরও যেন প্রয়োজন না থাকে ধীরে ধীরে সেই দিকে এগোনো প্রয়োজন।

"দলিল লেখকদের ব্যপারেও যেটা ভাবা হচ্ছে বা ভাবা উচিত যে, সেটাও যদি পরিপূর্ণ ডিজিটাইজ করা সম্ভব হয় ভূমি খাতে বা সেবা খাতে, তাহলে কিন্তু দলিল লেখকদের প্রয়োজনীয়তাটা শেষ হয়ে যাবে। সেই কারণেই কিন্তু ভূমি খাতে এন্ড টু এন্ড ডিজিটাইজেশন হচ্ছে না ইন্টারনাল রেজিস্টেন্সের কারণে। কারণ এই দলিল লেখক হিসেবে যে চক্র তাদের যে সুবিধা সেটার সুবিধাভোগি বা অংশীদার কিন্তু উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাই।"

অনলাইনে ই পাসপোর্ট করার ডিজিটাল পদ্ধতিত গ্রামের সাধারণ মানুষের সহায়তা নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এছাড়া শহরেও অনেকে মানুষও ঝামেলা এড়াতে ও সময় বাঁচাতে এজেন্টদের কাছে দায়িত্বে ছেড়ে দেয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে এই পদক্ষেপের যুক্তি হিসেবে বলেছেন, বাংলাদেশে জনসংখ্যার অধিকাংশই এখনো অনলাইনে ইলেকট্রনিকভাবে আবেদন করতে অভ্যস্ত নয়। সেইজন্য কারো কারো সহযোগিতা নিতে হয়।

টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই কথাটা মানা খুব কঠিন, কারণ যারা কম্পিউটারে কাজ করতে পারে না তারাই কিন্তু ফেইসবুক ইউজ করছে। তাদের আত্মীয় স্বজন প্রিয়জন এটা করছে।

"এই কথাটা কিন্তু সকল সেবাখাতের জন্য প্রযোজ্য। শুধু পাসপোর্টের জন্য আলাদা কেন হবে। আমাদের আলটিমেট অবজেকটিভ হবে যেটা তাদের ইশতেহারেও আছে, ঘোষণায় আছে যে সেবাখাত ডিজিটাইজেশন করা হবে। তো পুরো সেবাখাতটাকে যখন আমরা ডিজিটাইজ করতে পারবো তখন কিন্তু আর মিডলম্যান এদের প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।"

টিআইবি মনে করে যতই আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে আইনি বৈধতা দেয়া হোক না কেন বাস্তবক্ষেত্রে এটা সাধারণ মানুষকে আরেক দফা অনিয়মের শিকার এবং আরেকদফা পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে খরচটাকে বৃদ্ধি করবে।

"সেবার জন্য নির্দিষ্ট সেবামূল্য যে নেবে সেটার নিশ্চয়তা কে দেবে? এটাকে তারা অধিকতর প্রতারণার সুযোগ হিসেবে নেওয়ার ঝুঁকিটা আছে। কারণ এই যে দালাল চক্র ব্যবসাটা অব্যাহত রাখতে চায়"।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়