মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দান-সদকা করে, তাহাজ্জুদে কাঁদে— তারপরও এমন একটি পাপ আছে, যা নিঃশব্দে তার নেক আমলগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। হাশরের ময়দানে যখন মানুষ নিজের আমলনামা হাতে পাবে, তখন কেউ আনন্দে উজ্জ্বল হবে, আবার কেউ হতবাক হয়ে যাবে। কল্পনা করুন, একজন মানুষ দেখছে— তার নামাজ নেই, রোজা নেই, দান নেই, কোনো নেক আমলই অবশিষ্ট নেই!
সে কাঁদতে কাঁদতে বলবে— ‘ইয়া আল্লাহ! আমি তো ইবাদত করতাম, আমার আমলগুলো কোথায় গেল?’
তখন তাকে বলা হবে— ‘তুমি মানুষের সম্মান নষ্ট করেছিলে, গীবত করেছিলে। তাই আজ তোমার আমলগুলো অন্যদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ এই ভয়ংকর বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.)।
গীবত— নীরব কিন্তু ভয়ংকর একটি পাপ
গীবতকে আল্লাহ এমন ঘৃণ্যভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন মানুষ নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাচ্ছে। কারণ গীবত মানুষের সম্মানকে হত্যা করে, সম্পর্ক ধ্বংস করে এবং অন্তরকে কালো করে দেয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন—
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
‘তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করবে।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১২)
গীবত কী?
কারও দোষ, দুর্বলতা বা অপছন্দনীয় বিষয় তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করাই গীবত—তা সত্য হলেও। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন—
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟
‘তোমরা কি জানো গীবত কী?’
সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন।’
তখন তিনি (সা.) বললেন—
ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ
‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।’ (মুসলিম ২৫৮৯)
কিয়ামতের দিন নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ভয়ংকর দৃশ্য
এটাই সেই ভয়ংকর পরিণতি, যেখানে একটি মানুষের বহু বছরের ইবাদত অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হবে শুধুমাত্র জিহ্বার গুনাহের কারণে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا...
‘আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তি সে, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও ওপর অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ ভক্ষণ করেছে…। অতঃপর তার নেক আমলগুলো মজলুমদের দিয়ে দেওয়া হবে। আর নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (মুসলিম ২৫৮১)
কেন গীবত এত ভয়ংকর?
অনেক মানুষ তাহাজ্জুদ পড়ে, কুরআন তিলাওয়াত করে; কিন্তু আড্ডায় বসে মানুষের সমালোচনা করতে করতে নিজের নেক আমল শেষ করে ফেলে। কারণ গীবত শুধু একটি কথা নয়—এটি মানুষের সম্মানহানি।
একটি কটু আলোচনা—
> বন্ধুত্ব নষ্ট করে,
> পরিবার ভেঙে দেয়,
> অন্তরে হিংসা জন্ম দেয় এবং
> অজান্তেই আমলনামা শূন্য করে দেয়।
কীভাবে নিজেকে বাঁচাবো?
> কথা বলার আগে ভাবুন—এটি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে?
> কারও দোষ দেখলে তা গোপন করুন।
> আড্ডায় গীবত শুরু হলে বিষয় পরিবর্তন করুন বা সরে যান।
> নিজের দোষ নিয়ে ব্যস্ত থাকুন।
> বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করুন।
তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি ৬০১৮)
কিয়ামতের দিন মানুষ তার সম্পদ, সৌন্দর্য কিংবা পরিচয়ের কারণে সফল হবে না; সফল হবে তার বিশুদ্ধ আমল ও পরিষ্কার অন্তরের কারণে। তাই আসুন, আমরা নামাজ-রোজার পাশাপাশি নিজেদের জিহ্বাকেও সংযত করি। কারণ একটি গীবত হয়তো এমন ক্ষতি করে দিতে পারে, যা হাজারো নফল ইবাদতও পূরণ করতে পারবে না। আল্লাহ আমাদের জিহ্বাকে হেফাজত করার তৌফিক দিন, গীবতের ভয়াবহতা বুঝার তৌফিক দিন এবং নেক আমলগুলোকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমিন।