হজ ও ওমরাহ মুমিনের জীবনে পরম সৌভাগ্য ও মর্যাদার প্রতীক। এই সময় বান্দা আল্লাহর ঘর, রাসুলের রওজা, ইসলামের ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শনের সুযোগ লাভ করে। বরকত এসব স্থান বান্দার আমলকে আরো তাত্পর্যপূর্ণ করে তোলে। হজের সফরে মক্কা ও মদিনায় শরিয়তের নির্ধারিত আমলের বাইরে যে কোনো নফল আমল করার সুযোগ আছে, তবে স্থানগত বৈশিষ্ট্যের কারণে মক্কা ও মদিনায় পৃথক পৃথক কিছু আমল করার কথা বলেন। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো
মক্কায় যেসব আমল বেশি করব
অভিজ্ঞ আলেমরা বলেন, হাজিগণ মক্কায় অবস্থানের সময় সেসব আমলকে প্রাধান্য দেবেন যেগুলোর স্থান হিসেবে মক্কার সঙ্গে বিশেষায়িত। যেমন—
১. মসজিদুল হারামে নামাজ আদায় : মহানবী (সা.) মসজিদুল হারামে নামাজ পড়ার বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘মসজিদুল হারামে নামাজ আদায় করা অন্য মসজিদে নামাজ আদায়ের চেয়ে এক লাখ গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ।’ (সহিহুল জামি, হাদিস : ৪২১১)
২. অধিক পরিমাণে তাওয়াফ করা : তাওয়াফ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। কোনো কোনো আলেমের মতে, মসজিদুল হারামে নফল নামাজের পরিবর্তে বেশি বেশি তাওয়াফ করা উত্তম। কোরআনেও তাওয়াফকে নামাজের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার ঘর পবিত্র রেখো তাদের জন্য যারা তাওয়াফ করে এবং যারা নামাজে দাঁড়ায়, রুকু করে ও সিজদা করে।’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৬)
৩. জমজমের পানি পান : জমজমের কূপ আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন এবং এর পানি অত্যন্ত বরকতময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) জমজমের পানি পেটভরে পান করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, নিশ্চয় তাই (জমজমের পানি) বরকতপূর্ণ, পরিতৃপ্তিকর খাদ্য এবং রোগের প্রতিষেধক। (সহিহুল জামে, হাদিস : ২৪৩৫)
৪. হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা : সুযোগ থাকলে এবং অতিরিক্ত ভিড় না থাকলে রুকনে ইয়ামানি স্পর্শ করা এবং হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া। কেননা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানি ছাড়া কাবার কোনো অংশে চুমু খেতেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৬০৯)
৫. দোয়া কবুলের স্থানে দোয়া করা : হেরেমের ভেতর দোয়া কবুলের একাধিক স্থান রয়েছে। এসব স্থানে বেশি বেশি দোয়া করা। যেমন কাবা ঘর দেখার সময়, মুলতাজিমে, মিজাবে রহমতের নিচে, মাকামে ইবরাহিমে, জমজমের পানি পান করার সময়, তাওয়াফ ও সায়ির সময়, হেরেমে সিজদারত অবস্থায়, রুকনে ইয়ামানি ও আসরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে।
মদিনায় যেসব ইবাদত বেশি করব
প্রাজ্ঞ আলেমরা মদিনায় অবস্থানের সময় নিম্নোক্ত আমলগুলো অধিক পরিমাণে করার তাগিদ দিয়েছেন। তা হলো—
১. নফল নামাজ আদায় : মসজিদে নববীতে অধিক পরিমাণে নামাজ আদায় করা উত্তম। কেননা মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মসজিদুল হারাম (কাবা) ছাড়া আমার এ মসজিদে সালাত আদায় করা অন্য মসজিদের তুলনায় এক হাজার গুণ বেশি সওয়াব। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৯০)
২. বেশি বেশি দরুদ পাঠ : মদিনা শরিফ মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিধন্য শহর এবং তিনি সেখানে শুয়ে আছেন। তাই মদিনায় অবস্থানের সময় বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কেউ আমার ওপর সালাম পেশ করলে আল্লাহ আমার ‘রুহ’ ফিরিয়ে দেন এবং আমি তার সালামের জবাব দেই।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২০৪১)
৩. রওজা জিয়ারত করা : মহানবী (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করা অত্যন্ত বরকতময় আমল। কেননা নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সাক্ষাতে এলো এবং আমার সাক্ষাতই কেবল তার উদ্দেশ্য হয়, আমার জন্য তার জন্য সুপারিশ করা আবশ্যক হয়ে যায়।’ (তাখরিজু ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, হাদিস : ৭৭২)
৪. রিয়াজুল জান্নাতে দোয়া করা : রিয়াজুল জান্নাত দোয়া কবুলের স্থান। এই স্থানের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগানগুলোর মধ্য থেকে একটি বাগান। আমার মিম্বর হাউজের ওপর স্থাপিত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩৩৫)
৫. ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শন করা : মহানবী (সা.) মদিনার কিছু স্থানে নিয়মিত যেতেন। মদিনায় অবস্থানের সময় হাজিদের উচিত সুযোগ থাকলে সেখানে যাওয়া। যেমন মসজিদে কুবা—এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব, জান্নাতুল বাকি কবরস্থান জিয়ারত করা এবং উহুদের ময়দানে যেয়ে শহীদদের জন্য দোয়া করা।
আল্লাহ সবাইকে যথাযথভাবে হজ করার তাওফিক দিন। আমিন।