বিশ্ব প্রতিরক্ষা মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’। তুর্কি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিইউএসএএস) তাদের এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের সময়সীমা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে তুরস্কের দীর্ঘদিনের মিত্র পাকিস্তান। নির্ধারিত সময়ের অন্তত দুই বছর আগেই এই স্টিলথ ফাইটারগুলোর প্রথম ব্যাচ হাতে পেতে পারে পাকিস্তান বিমানবাহিনী (পিএএফ), যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টিইউএসএএস-এর সিইও মেহমেত ডেমিরোগ্লু সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘কান’ প্রকল্পের সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, স্ট্রাকচারাল টেস্টিং এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে তারা তাদের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দুই বছর আগেই বড় আকারের উৎপাদন শুরু করতে পারছেন। এর আগে ধারণা করা হয়েছিল যে, ২০৩০ সালের আগে এই বিমানের পূর্ণ উৎপাদন সম্ভব হবে না। কিন্তু বর্তমানে পি-১ (পি-১) এবং পি-২ প্রোটোটাইপগুলো ইতিমধ্যেই উচ্চ-উচ্চতা, সুপারসনিক গতি এবং হাই-জি ম্যানুভারিংয়ের মতো কঠিন সব পরীক্ষা সফলভাবে পার করছে। এরফলে আশা করা হচ্ছে, ২০২৮ সাল নাগাদ ইসলামাবাদের বিমানবহরে যুক্ত হবে পঞ্চম প্রজন্মের এই অত্যাধুনিক ফাইটার জেট।
তুরস্ক দাবি করছে যে, এই যুদ্ধবিমানটি আমেরিকার এফ-৩৫ এর মতোই শক্তিশালী এবং এটি অত্যন্ত উন্নতমানের স্টিলথ (রাডার ফাঁকি দেওয়ার) সক্ষমতা সম্পন্ন। ফলস্বরূপ, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে এটি ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের বিমানবাহিনীকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
‘কান’ প্রকল্পে পাকিস্তানের ভূমিকা কেবল একজন ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে। গত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের প্রায় ২০০ জন দক্ষ অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার সরাসরি এই প্রকল্পের উন্নয়ন ও নকশা প্রণয়নে কাজ করছেন। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় পাকিস্তানে একটি যৌথ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে পাকিস্তান কেবল এই বিমান ব্যবহার করবে না, বরং এর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি এবং ভবিষ্যতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদনের মাধ্যমে নিজস্ব প্রযুক্তির সক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে।
তুর্কি ও পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ‘পাক-তুর্কি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সপো’-এর মতো উচ্চপর্যায়ের প্ল্যাটফর্মে এই সহযোগিতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চলছে। পাকিস্তানের এই অংশগ্রহণ দেশটিকে বিশ্বমানের পঞ্চম প্রজন্মের প্রযুক্তিতে সরাসরি প্রবেশাধিকার দিচ্ছে।
‘কান’ ফাইটার জেটের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব
তুরস্কের এই ‘টিএফ-এক্স’ বা ‘এমএমইউ' একটি দুই ইঞ্জিনের মাল্টি-রোল স্টিলথ ফাইটার। এর বিশেষ নকশা রাডারের চোখ এড়িয়ে চলতে সক্ষম। স্টিলথ বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে এর অস্ত্রগুলো বিমানের পেটের ভেতরে লুকানো থাকে।
তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি উন্নত সেন্সর স্যুট এবং রাডার একে বিশ্বের সেরা যুদ্ধবিমানগুলোর কাতারে নিয়ে এসেছে।আফটার বার্নার ব্যবহার না করেই সুপারসনিক গতিতে দীর্ঘক্ষণ ওড়ার ক্ষমতা রয়েছে। ডেমিরোগ্লু গর্বের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানে বিশ্বের মাত্র চারটি দেশ এই পর্যায়ের প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা রাখে, যার মধ্যে তুরস্ক এখন একটি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর জন্য ‘কান’ ফাইটার জেট হবে একটি গেম-চেঞ্জার। বর্তমানে পিএএফ তাদের বহরে জে-১০সি এবং জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩ যুক্ত করে আধুনিকায়ন অব্যাহত রাখলেও, একটি পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটারের অভাব দীর্ঘদিনের।
‘কান’ যুক্ত হওয়ার ফলে ভারতের রাডার ব্যবস্থা এবং এস-৪০০ এর মতো বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রকে ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে পাকিস্তান। জেএফ-১৭ প্রোগ্রামের সফলতার পর ‘কান’ প্রকল্প পাকিস্তানের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে। তুরস্কের সাথে যৌথ উৎপাদনের ফলে পাকিস্তান ভবিষ্যতে নিজস্ব ফাইটার জেটের ইঞ্জিন ও অ্যাভিওনিক্স তৈরির জ্ঞান অর্জন করবে।
ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ ও সামরিক ভারসাম্য
ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে এই খবরটি ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ) বর্তমানে রাশিয়ার সুখোই-৫৭ কেনার বিষয়ে আলোচনা করলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। এছাড়া ভারতের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের বিমান ‘এএমসিএ’ এখনও উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর সফল হতে আরও অন্তত এক দশক সময় লাগতে পারে।পাকিস্তান যদি ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে ‘কান’ হাতে পায়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে ভারত অন্তত ৩-৪ বছরের জন্য প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, ভারতের কাছে থাকা বর্তমান সেরা যুদ্ধবিমান ‘রাফাল’ ৪.৫ প্রজন্মের। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটারের সামনে এর টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদি এই যুদ্ধবিমান দ্রুত মোতায়েন করতে পারে, তবে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা বলয়ে একটি বড় ফাটল তৈরি হতে পারে।
তুরস্ক কেবল পাকিস্তানের কাছেই নয়, বরং আজারবাইজান, মালয়েশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও এই বিমান বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ‘কান’ প্রকল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা কয়েক বিলিয়ন ডলারের। পশ্চিমা দেশগুলোর (যেমন যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর বিকল্প হিসেবে ‘কান’ বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।
তুরস্ক বর্তমানে এই বিমানে মার্কিন ইঞ্জিন ব্যবহার করলেও ২০৩২ সালের মধ্যে নিজস্ব ‘TF35000’ ইঞ্জিন তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর ফলে তুরস্ক এবং এর অংশীদার রাষ্ট্রগুলো যে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে। বর্তমানে পিএএফ পাইলটদের ফিডব্যাক এবং প্রকৌশলগত তথ্যের ভিত্তিতে বিমানটির ডিজাইনকে আরও পরিশীলিত করা হচ্ছে।
তুরস্কের ‘কান’ স্টিলথ ফাইটার কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়, এটি তুরস্ক ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক বন্ধুত্বের একটি মূর্ত প্রতীক। উৎপাদন সময়সীমা দুই বছর এগিয়ে আসা পাকিস্তানের জন্য এক বিরাট কৌশলগত বিজয়। এটি কেবল আকাশসীমায় শ্রেষ্ঠত্বই দেবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করবে। ভারতের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা, যা তাদের নিজস্ব সমরাস্ত্র উৎপাদন এবং ক্রয়ের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে বাধ্য করবে।
আসন্ন মাসগুলোতে ‘কান’-এর প্রথম আনুষ্ঠানিক ফ্লাইটগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব প্রতিরক্ষা গোষ্ঠী। এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যেখানে দেশটি কেবল একজন আমদানিকারক নয়, বরং একটি উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদনকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
*সূত্র: টাইমস অব ইসলামাবাদ, ইন্ডিয়া ডটকম