শিরোনাম
◈ মমতার বিস্ফোরক মন্তব্যেও নীরব দিল্লি, বক্তব্য নেই বিজেপির ◈ মরুভূমির দেশ হয়েও কেন বালু আমদানি করে সৌদি আরব? ◈ মাত্র ১৭০ টাকায় অনলাইনে এনআইডি বিক্রি! ◈ বাড়তি মার্কিন শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা ◈ শেখ হাসিনার পক্ষের দাবি নাকচ, জুলাই অভ্যুত্থান প্রতিবেদনের পাশে জাতিসংঘ ◈ কারামুক্ত হলেন সাবেক মেয়র আইভী ◈ দিল্লির আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত ২১; আহতদের মধ্যে ৫ বাংলাদেশি ◈ ‘আসল’ তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ঋতব্রতের হাতে, মমতাকে উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব ◈ অস্ট্রেলিয়ার বিরু‌দ্ধে বাংলা‌দে‌শের ওয়ান‌ডে দল ঘোষণা, মিরাজ অ‌ধিনায়ক ◈ বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ তুলে নিল সরকার

প্রকাশিত : ১৬ মে, ২০২৬, ০৫:৪৭ বিকাল
আপডেট : ০৪ জুন, ২০২৬, ০২:০০ রাত

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

হামের পর ডেঙ্গু, সরকারকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ

মহসিন কবির: হামের ভয়াবতায় গত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন চিকিৎসক ও অভিভাবকসহ দেশবাসী। এর মধ্যেই দেশে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এবার ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করেছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৮১ জন এবং মারা গেছেন চারজন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ২৭৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৪০৯ জন এবং ঢাকা সিটির বাইরে ৪০৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে ঢাকা জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১০৯১ জন। এ ছাড়া বরিশালে ৬২১, চট্টগ্রামে ৬১২, খুলনায় ১৭৩, রাজশাহীতে ১১৫, ময়মনসিংহে ৮৭, রংপুরে ২৭ এবং সিলেটে ২৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ সময়ে মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে ডিএনসিসি এলাকায় একজন ও ঢাকা সিটির বাইরে একজন এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে দুজন। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে

সিটি করপোরেশনগুলোর ভাষ্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। ডিএনসিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে তাদের এলাকায় হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ছিল ৫০ জন। ২০২৫ সালের মার্চে তা কমে দাঁড়ায় ২৭ জনে। চলতি বছরের এপ্রিলেও আক্রান্তের সংখ্যা ৩১ জন। উত্তর সিটি কর্তৃপক্ষ বলছে, এবার বৃষ্টির তীব্রতা বেশি থাকায় অনেক লার্ভা ভেসে গেছে। নতুন কোনো ভাইরাসও এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়নি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যায় না। কারণ অনেক রোগী বাসায় অথবা বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনও এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ২০ শতাংশের বেশি। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ বা বিআই ২০-এর ওপরে থাকলে ওই এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের ৯৮ শতাংশ পরবর্তীতে চিকুনগুনিয়ায় সংক্রমিত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক একই এডিস মশা। ফলে এডিসের বিস্তার বাড়লে দুই রোগের ঝুঁকিও একসঙ্গে বাড়ে। গত কয়েক দিনের রোদ-বৃষ্টির আবহাওয়া মশার বংশবিস্তারেও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার গণমাধ্যমকে বলেছেন, এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর ও ময়মনসিংহসহ কয়েকটি জেলার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ঢাকার প্রায় সব এলাকাতেই ব্রুটো ইনডেক্স ২০ শতাংশের ওপরে। এটি বড় ধরনের সতর্কসংকেত।

এই কীটতত্ত্ববিদ আরও বলেন, গতানুগতিক ফগিং ও স্প্রে করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎস চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। কিউলেক্স ও এডিস মশার জন্য আলাদা কর্মসূচি প্রয়োজন। একই সঙ্গে কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।

ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও। সংস্থাটি মনে করছে, বর্ষা শুরু হওয়ায় ঈদুল আজহার পর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এ জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘পরিস্থিতি কেমন হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। ডেঙ্গু কর্নার ও শিশু কর্নার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সভাও হয়েছে। এখন রোগী কম থাকলেও সামনে বাড়তে পারে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, সাপ্তাহিক ‘ক্লিনিং ডে’র আওতায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে তিনি নাগরিকদের সচেতন হতে এবং এডিস মশা প্রতিরোধে তাদের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, নিজেদের বাসাবাড়ি ও আশপাশে পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব।

অন্যদিকে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক। এবার আমরা ফগিং কমিয়ে লার্ভিসাইডিং ও উৎস ধ্বংসে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। যেখানেই পানি জমছে, তা দ্রুত পরিষ্কার করার চেষ্টা চলছে।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, জুন-জুলাই কিংবা আগস্টে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে।

মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর অনেক নির্মাণাধীন ভবন, বাসাবাড়ির ছাদ, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা ও জলাবদ্ধ স্থানে এখনও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নিয়মিত ময়লা অপসারণ ও নালা পরিষ্কারের কার্যক্রমও ধীরগতির।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়। সারাবছরই কমবেশি আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, আগে বলা হতো স্বচ্ছ পানিতে এডিসের লার্ভা জন্মায়। এখন প্রায় সব ধরনের জমে থাকা পানিতেই লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকলেই ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নাগরিক সচেতনতা এবং সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নির্মূল সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণকাজ ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ডেঙ্গু বিস্তারের বড় কারণ। সিটি করপোরেশনগুলোর দাবি অনুযায়ী ঢাকার বাইরে থেকে অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে আসেন। এতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি দেখায়। তবে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এই যুক্তির বাস্তবতা থাকলেও তা পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা হতে পারে না।

তাদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনও সমন্বয়ের অভাব। সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, ওয়াসা ও নগর পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়