শিরোনাম
◈ নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফে অসন্তোষ, বিইআরসিকে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ মন্ত্রণালয়ের ◈ ‘আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’, মায়ের মৃত্যু নিয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন নিহতের ছোট ছেলে বুয়েট অধ্যাপক ◈ কুমির সরিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি, মাজারের দিঘিতে ফেরত চাইলেন খাদেম ◈ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বকাপ মোবাইলে খেলা দেখবেন যেভাবে ◈ ইরান অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা, আর ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র: রুবিও ◈ স্বামী-সন্তান কানাডা প্রবাসী, সেই মিরপুরেই মিলল আরেক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ ◈ গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের ১০টি পুশইন অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি ◈ অবশেষে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ◈ তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ, দিনাজপুরে সর্বোচ্চ ৩৮.৫° সেলসিয়াস, আজও ঝড়-বৃষ্টির আভাস ◈ মার্কিন অবরোধের প্রভাব: ভিসা-মাস্টারকার্ড লেনদেন স্থগিতের ঘোষণা কিউবার

প্রকাশিত : ১২ মে, ২০২৬, ১১:৫৫ দুপুর
আপডেট : ০১ জুন, ২০২৬, ০৮:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

হামের ভয়াবহতার মধ্যে ভয় দেখাচ্ছে ডেঙ্গু!

সহযোগীদের খবর: প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীসহ সারা দেশে টানা কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের পর আবারও বেড়েছে মশার প্রকোপ। তবে এবার আর কিউলেক্স মশা না, বাড়ছে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিসের বিস্তার। গত পাঁচ বছরের হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে সারা দেশে মোট মৃত্যুর অর্ধেকই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। তাই এবার ডেঙ্গু নিয়ে আগাম সতর্কতার কথা জানিয়েছেন দুই সিটির কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, এডিস মশা প্রতিরোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সারা দেশে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজনই রাজধানীর বাসিন্দা। সূত্র: আজকের পত্রিকা প্রতিবেদন

গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এ রকম বৃষ্টিতেই পথঘাট ছাড়াও পরিত্যক্ত বোতল বা পাত্র, ডাবের খোসা ইত্যাদিতে জমা পানিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টিপাতের আগে প্রচণ্ড গরমে কিউলেক্স প্রজাতির মশার বিস্তার ঘটেছিল। বৃষ্টির ফলে সেই মশা থেকে রেহাই পেয়েছে নগরবাসী। তবে জমা পানির কারণে এখন বাড়ছে এডিস মশার বংশ।

গুলশান অঞ্চলের বিশাল কড়াইল বস্তির বাসিন্দা আকরাম মিয়া বড় রাস্তায় একটি ফলের দোকানে কাজ করেন। তিনি জানান, মশার কয়েল না জ্বালিয়ে দোকানে বসা যায় না। আজকের পত্রিকাকে আকরাম বলেন, ‘দিনের বেলায়ও কয়েল ধরাইতে হয়। এখন তো ডেঙ্গু (এডিস) মশার সিজন। এই মশা তো দিনেই নাকি বেশি কামড়ায়।’

গুলশান লেকের যে অংশ ঘেঁষে কড়াইল বস্তির অবস্থান, তা প্রায় সারা বছরই জঞ্জালে ভরা থাকে। লেকের ঘোলা বদ্ধ পানি মশার অন্যতম বড় প্রজনন ক্ষেত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে এডিস স্বচ্ছ পানিতে বংশ বৃদ্ধি করলেও সাম্প্রতিককালে ঢাকায় তাঁরা নোংরা পানিতেও এ মশার জন্ম হতে দেখছেন।

রাজধানীজুড়ে সব সময় বহু ভবন নির্মাণাধীন থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘসময় লাগে এসবের কাজ শেষ হতে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের স্থাপনায় জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুর বংশবিস্তার হচ্ছে। জায়গাগুলো নজরে রেখে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করলে এ বছর ডেঙ্গুর মাত্রা গত বছরের তুলনায় বাড়তে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণি- বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবাহিত রোগবিষয়ক গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার আজকের পত্রিকাকে জানান, এখনই যথাযথ প্রস্তুতি না নিলে সামনে ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়ার ফলে এডিস মশা বাড়বে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুও বাড়বে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। যেসব কীটনাশক প্রয়োজন তার পর্যাপ্ত মজুদ রাখতে হবে সিটি কর্তৃপক্ষকে।

রাজধানীতে এবার ডেঙ্গুর মাত্রা কেমন হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে কবিরুল বাশার বলেন, ‘এবারের ডেঙ্গুর ঢেউ ২০২৩ সালের মতো ব্যাপক হয়তো হবে না। তবে গত বছরের চেয়ে বেশি হতে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া গত ৫ বছরের ডেঙ্গু রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকই ছিল রাজধানীর বাসিন্দা। দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে রাজধানীর দক্ষিণে মৃত্যুর হার বেশি। প্রতিবছরের মে-জুন মাসে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের সংখ্যার সূচক ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা গেছে।

মৃত্যুর হিসাব ঊর্ধ্বমুখী

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে রাজধানীতে ৯৫ জন এবং সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২২ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। সে বছর সারা দেশে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে রাজধানীতেই মারা যান ১৭৩ জন। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী। বছরটিতে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মারা যায় রাজধানীতে। সারা দেশে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে যথাক্রমে ৫৭৫ ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। সাম্প্রতিককালের নতুন বিপদ হচ্ছে, আগে মূলত ঢাকাসহ নগরে সীমিত থাকলেও এডিস মশা এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলতি বছরও সরকার ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে আক্রান্ত এলাকায় কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) পাঠিয়ে বিশেষ মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জনসচেতনতা বাড়াতে ‘শনিবারের অঙ্গীকার, নিজ নিজ বাসা-বাড়ি করি পরিষ্কার’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। লিফলেট, এসএমএস এবং গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনসহ সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে এ বছর আগাম সতর্ক তাঁরা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্রেন, খাল ও জলাবদ্ধ স্থান পরিষ্কার অভিযান চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাইকিংয়ের মাধ্যমে নাগরিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। কিছু নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, রোববার থেকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধে বাউল গানের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) রোববারই প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাজধানীর ৭৫ ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর হটস্পট শনাক্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘প্রাক্‌-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। এ সময় ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দায়িত্বে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।

এ ছাড়া ডিএসসিসি বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও সচেতনতা কার্যক্রম, খাল, ড্রেন ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা কমাতে পোর্টেবল পাম্প ব্যবহারের উদ্যোগ এবং প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালনের ঘোষণা দিয়ে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। গতকাল তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হাম বা অন্য কোনো রোগের কারণে ডেঙ্গুকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

হালিমুর রশিদ বলেন, ‘আজও (গতকাল) ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে দেশের প্রতিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে, যাতে রোগী শনাক্ত, চিকিৎসা ও সমন্বয় কার্যক্রম দ্রুত করা যায়। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক, বিশেষ করে স্যালাইন, ওষুধ ও পরীক্ষার সামগ্রী জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞের বহুমাত্রিক পরামর্শ

এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের জন্য বর্তমান নগর কাঠামোকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেন নগর বিশেষজ্ঞ, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাজধানীতে জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। এত জনঘনত্বপূর্ণ স্থানে মশাবাহিত রোগ খুব দ্রুত ছড়ায়। ঢাকায় বৃষ্টিপাতের সময়ে নানা কারণে জলাবদ্ধতা হয়। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ (শহরের যেসব স্থানে উষ্ণতা বেশি) এর প্রভাব থাকে, যার ফলে মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।’

আদিল মুহাম্মদ খান এ কারণে সমন্বিত নগর পরিকল্পনা এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণের নামে সিটি করপোরেশন মূলত ফগিং করে থাকে, যা কার্যত লোকদেখানো। কিন্তু পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানো বা জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ তাদের নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা এবং জৈবিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারব, ততক্ষণ শুধু কেমিক্যাল দিয়ে ফগিং করে কোনো লাভ হবে না।’

এ বছর ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়বে এমন আশঙ্কা জানিয়ে এই নগর গবেষক বলেন, ‘পরিসংখ্যান আমাদের সে তথ্যই দিচ্ছে। নগর কাঠামোর কোনো পরিবর্তন না হওয়া এবং বর্তমান নগর পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়