এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নৌপথে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে আবারও সশস্ত্র হামলা ও ডাকাতির চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। একদল অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত ভারতগামী পাঁচটি কার্গো জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর মধ্যে একটি জাহাজে উঠে তারা কর্মীদের জিম্মি করে মারধর, গুলিবর্ষণ ও লুটপাট চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত শনিবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনের শিবসা নদী অতিক্রম করে শিংয়েনালা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার জাহাজটির নাম এমভি আব্দুল হাকিম-১। তবে বহরে থাকা অন্য চারটি জাহাজ দ্রুত গতি বাড়িয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে সক্ষম হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।
জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় পরিচালিত পাঁচটি কার্গো জাহাজ ঢাকা থেকে মোংলা বন্দর হয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহার করে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। জাহাজগুলো খালি অবস্থায় ভারত যাচ্ছিল এবং সেখান থেকে সিমেন্ট শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ‘ফ্লাই অ্যাশ’ নিয়ে ফেরার কথা ছিল।
বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকল কমিটির কার্যকরী সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, শনিবার দুপুর দুইটার দিকে জাহাজগুলো মোংলা বন্দর ত্যাগ করে। শেখবাড়িয়া এলাকা অতিক্রম করে শিবসা নদী পার হওয়ার পর শিংয়ের নালা খালের ভেতরে প্রবেশ করতেই একটি ট্রলারে করে আসা ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল জাহাজ বহরটিকে ধাওয়া করে।
তিনি বলেন, “হামলাকারীদের উপস্থিতি টের পেয়ে বহরের চারটি জাহাজ দ্রুত গতি বাড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। কিন্তু বহরের পেছনে থাকা এমভি আব্দুল হাকিম-১ জাহাজটিতে লাইফ জ্যাকেট পরিহিত সশস্ত্র ব্যক্তিরা উঠে পড়ে।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজে ওঠার পরপরই হামলাকারীরা নিচতলায় থাকা নাবিক ও কর্মচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে জাহাজের মাস্টার দ্রুত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা ব্রিজের সব দরজা বন্ধ করে দেন। এতে হামলাকারীরা ব্রিজে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়।
ক্ষুব্ধ দুর্বৃত্তরা পরে মাস্টার কেবিন লক্ষ্য করে শটগান দিয়ে ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দে পুরো জাহাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে জাহাজে অবস্থানকালে তারা কর্মীদের ব্যবহৃত মুঠোফোন, নগদ অর্থ এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নেয়। পরে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ঘটনার পর নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজ মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নৌপথে দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্নভাবে ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় পুলিশ কিংবা কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে হামলাকারীদের পরিচয় ও তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকল রুট দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নৌপথে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সুন্দরবনের নৌপথে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন জাহাজ মালিক, শ্রমিক এবং নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা।