ঈদুল আজহার গত ১৫ দিনে দেশে ৩৯৪ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত এবং নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন।
ফলে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৪৪২টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ১,৩৪০ জন আহত হয়েছেন।
রোববার (৭ জুন) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ তথ্য তুলে ধরেন।
সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ঈদযাত্রায় বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা ও ভোগান্তি কমাতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
তিনি বলেন, দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
উন্নত বিশ্বের আদলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা, মহাসড়ক থেকে ছোট যানবাহন পর্যায়ক্রমে অপসারণ, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন উচ্ছেদ করা জরুরি। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ‘স্টার’ মানের সড়ক নিরাপত্তা করিডোর গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।
সংগঠনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্ত এবং বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। এ ছাড়া চালক সংকটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একজন চালক দিয়ে বিরামহীনভাবে পরিচালনা করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে কর্মস্থলে ফেরা ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত ও ১,২৯৪ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত ও ১ হাজার ১৮২ জন আহত হয়েছিলেন। সে তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৮০ জন চালক, ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু, ৬৬ জন শিক্ষার্থী, পাঁচজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, তিনজন শিক্ষক, একজন চিকিৎসক, তিনজন সাংবাদিক, একজন প্রকৌশলী এবং চারজন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাস, ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ কার ও মাইক্রোবাস, ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ছিল।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার ৪৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ গাড়ির চাপা বা ধাক্কা, ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া, ১ দশমিক ৫২ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ এবং ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
অন্যদিকে দুর্ঘটনার ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ দশমিক ৭১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ ফিডার সড়কে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীতে ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম মহানগরীতে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ এবং রেলক্রসিংয়ে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সাবেক সচিব ড. এ ওয়াই এম একরামুল হক, যাত্রী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি মো. মহসিন, যুগ্ম মহাসচিব অর্পনা রায় দাশ, অর্থ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল, দপ্তর সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বিটু, মনজুর হোসেন ইসা, সুভাষ চন্দ্র দাশ ও মনজুর হোসেনসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদনে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, সড়কে রোড সাইন ও রোড মার্কিংয়ের অভাব, মিডিয়ান না থাকা, নির্মাণ ত্রুটি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি, বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালানো এবং বৃষ্টিতে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা ও ঈদযাত্রার ভোগান্তি কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ১১ দফা সুপারিশও তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া উন্নত করা, মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত নির্মাণ, চাঁদাবাজি বন্ধ, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, ফিটনেস পদ্ধতির আধুনিকায়ন, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।